KOFIPOST

KOFIPOST

দুই দশকে ২.৯ থেকে ৪৫ শতাংশ, বাংলাদেশে সিজারিয়ানের ভয়াবহ বৃদ্ধির কারণ কী?

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
দুই দশকে ২.৯ থেকে ৪৫ শতাংশ, বাংলাদেশে সিজারিয়ানের ভয়াবহ বৃদ্ধির কারণ কী?
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশে স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশু জন্মদানের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ৩৬ লক্ষ শিশুর মধ্যে ১৬ লক্ষ বা প্রায় ৪৫ শতাংশই সিজারিয়ান পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণ করেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার মোট প্রসবের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে এই হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে তিনগুণ বেশি। গত দুই দশকে এই বৃদ্ধি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৯৯ সালে যেখানে সিজারিয়ান প্রসবের হার ছিল মাত্র ২.৯ শতাংশ, ২০০৪ সালে তা চার শতাংশে পৌঁছায়। এরপর ২০০৩-০৪ সালের ৩.৯৯ শতাংশ থেকে দ্রুত বেড়ে ২০১৭-১৮ সালে ৩৩.২২ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০২২ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশে, যা প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে আরও বেশি, প্রায় ৫১ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র একটি সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং এর সাথে জড়িত রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা জটিলতা। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সংকট যা দেশের মাতৃস্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশে সিজারিয়ান প্রসবের এই উচ্চহার মূলত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত। দেশের বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রসব এখন সিজারিয়ান পদ্ধতিতে হয়। ২০২১ সালে মোট সিজারিয়ান প্রসবের প্রায় ৮৪ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সম্পন্ন হয়েছিল। বেসরকারি চিকিৎসা সুবিধাগুলোতে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার ৫২ শতাংশ, যেখানে সরকারি চিকিৎসা সুবিধায় এই হার মাত্র ১০.৬ শতাংশ। এই বিশাল পার্থক্য বেসরকারি ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে সেবার ধরন এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে স্পষ্ট করে তোলে।

বেসরকারি হাসপাতালে এই উচ্চহারের পেছনে রয়েছে প্রত্যক্ষ আর্থিক স্বার্থ। বেসরকারি সেক্টর মুনাফাভিত্তিক এবং বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের জন্য প্রণোদনা পান। সিজারিয়ান অপারেশন থেকে চিকিৎসক এবং হাসপাতাল উভয়েই স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় অনেক বেশি আর্থিক লাভ করেন। এই প্রণোদনা কিছু চিকিৎসককে মায়েদের সিজারিয়ান ডেলিভারির পরামর্শ দিতে প্রভাবিত করছে, এমনকি যখন তা চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারিতে গড়ে খরচ হয় প্রায় ২১,১২১ টাকা, যেখানে স্বাভাবিক ডেলিভারিতে খরচ মাত্র প্রায় ৫,০৬৯ টাকা। সরকারি হাসপাতাল ছাড়া বেসরকারি বা স্পেশালাইজড হাসপাতালে একটি সিজারিয়ান অপারেশনের খরচ সাধারণত ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত গিয়ে থাকে। ২০১৮ সালে চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের জন্য বাংলাদেশি অভিভাবকরা নিজ পকেট থেকে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছেন, যেখানে প্রতি ক্ষেত্রে গড় খরচ ছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এই বিপুল অর্থের চাপ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এক গুরুতর আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখা দেয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী দালাল এবং একশ্রেণীর চিকিৎসকদের প্রভাব মানুষকে সিজারিয়ান করতে উৎসাহিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সিজারিয়ানের পরামর্শ দিচ্ছেন। গর্ভবতী মায়েদের বোঝানো হচ্ছে যে স্বাভাবিক প্রসবে ঝুঁকি আছে বা শিশুর কোনো সমস্যা হতে পারে। এই ভীতি সঞ্চারের ফলে পরিবারগুলো নিরাপত্তার খাতিরে সিজারিয়ান অপারেশনে সম্মতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালে সমস্ত সিজারিয়ান অপারেশনের ৭৭ শতাংশ বা আনুমানিক ৮ লক্ষ ৬০ হাজার পদ্ধতি চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ছিল, যা ২০১৬ সালে ছিল ৫ লক্ষ ৭০ হাজার। অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের সংখ্যা ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বাণিজ্যিক স্বার্থ কীভাবে চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রকে গ্রাস করছে।

বিপরীতভাবে যারা সত্যিই সিজারিয়ান প্রয়োজন তাদের অনেকেই এই সেবা পাচ্ছেন না। প্রতি বছর প্রায় তিন লক্ষ নারী যাদের মারাত্মকভাবে সিজারিয়ান প্রয়োজন তারা তা পেতে অক্ষম। এই বৈষম্য দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের প্রতি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অসমতাকে প্রতিফলিত করে। একদিকে যেখানে অর্থ আছে এমন পরিবারগুলোকে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত প্রয়োজনে যাদের জীবন রক্ষাকারী এই সেবা দরকার তারা বঞ্চিত থাকছেন।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় দক্ষ মিডওয়াইফ বা ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন, সেখানে বাংলাদেশে এই পেশাজীবীদের সংখ্যা এবং গুণগত মান উভয়ই অপর্যাপ্ত। ফলে জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, স্বাভাবিক প্রসবকে সহায়তা করার দক্ষতা ও ধৈর্যের অভাবে।

সিজারিয়ান প্রসবের ক্রমবর্ধমান হারের পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো শিক্ষিত গর্ভবতী নারীরা প্রসব বেদনার ভয়ে এবং অন্যান্য সুবিধার জন্য স্বাভাবিক প্রসব এড়াতে চান। উচ্চ শিক্ষিত নারী ও তাদের স্বামীরা বিশেষ করে শহরাঞ্চলে স্বাভাবিক ডেলিভারির জটিলতা এড়াতে দ্বিধা ছাড়াই সিজারিয়ান পছন্দ করেন।

অনেকের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাস রয়েছে যে সিজারিয়ান ডেলিভারি স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় কম বেদনাদায়ক, নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর। প্রসব বেদনার ভয়, স্বাভাবিক প্রসবের পরে জননাঙ্গের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ, সিজারিয়ান মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ এই ধারণা মানুষকে এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকাচ্ছে। এছাড়া নির্দিষ্ট তারিখে অপারেশন করার সুবিধার জন্যও এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হচ্ছে। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী শুভ তারিখে সন্তান জন্মদানের আগ্রহও কিছু পরিবারকে পরিকল্পিত সিজারিয়ানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশনকে আধুনিক ও নিরাপদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাভাবিক প্রসবের দীর্ঘ সময় এবং ব্যথার বিষয়টি অনেকে এড়াতে চান। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনও সিজারিয়ান বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্বাভাবিক প্রসবকে কষ্টসাধ্য ও সেকেলে মনে করার প্রবণতা বাড়ছে।

গ্রাম ও শহরাঞ্চলের মধ্যে সিজারিয়ান প্রসবের হারে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশি মায়েদের মধ্যে সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রাদুর্ভাব ২৪ শতাংশ হলেও শহরাঞ্চলে তা ৩৬.৯ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে মাত্র ১৭.৯ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই উচ্চহারের কারণ হিসেবে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং এনজিওভিত্তিক স্বাস্থ্য সুবিধার সংখ্যা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। শহরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা এবং এর আর্থিক আকর্ষণ উভয়ই এই বৈষম্যের জন্য দায়ী।

ভৌগোলিক বিভাজনের দিক থেকেও পার্থক্য লক্ষণীয়। খুলনা বিভাগে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার সর্বোচ্চ ৩৫.২ শতাংশ, এরপর ঢাকায় ৩২.৯ শতাংশ, রাজশাহীতে ২৮ শতাংশ, চট্টগ্রামে ২০.১ শতাংশ, বরিশালে ১৯.৯০ শতাংশ, রংপুরে ১৯.৫০ শতাংশ এবং সিলেটে ১৩.৩০ শতাংশ। এই বিভাগীয় পার্থক্য অঞ্চলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, আর্থিক সামর্থ্য এবং সামাজিক সচেতনতার ভিন্নতাকে প্রতিফলিত করে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। অপারেশনের সময় সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ এবং এনেসথেসিয়ার জটিলতার আশঙ্কা থাকে। পরবর্তী গর্ভধারণে প্লাসেন্টা সংক্রান্ত সমস্যা এবং জরায়ু ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রেও শ্বাসকষ্ট এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মায়েদের দীর্ঘস্থায়ী পেটের ব্যথা এবং পরবর্তী গর্ভধারণে জটিলতার হার বৃদ্ধি পায়।

উচ্চ সিজারিয়ান হার মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের উপর বৃহত্তর প্রভাব ফেলে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর বোঝা বাড়ায়। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সরকার যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতা সেই সাফল্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। কারণ সিজারিয়ান অপারেশনে জটিলতার হার বেশি এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মা ও শিশু উভয়ের ওপরই পড়ে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এখানে সিজারিয়ানের হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও সেবার মান এবং পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব রয়েছে। অনেক গর্ভবতী মা সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং ভিড়ের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে গিয়ে তারা সিজারিয়ানের পরামর্শ পাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের সুবিধা ও পরিবেশ উন্নত করতে পারলে অনেকে বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন না।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন অংশীদারদের সাথে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বন্ধ করার জন্য একটি প্রচারাভিযান শুরু করেছে যা সচেতনতা তৈরি, নীতি প্রভাবিত করা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে। তবে এই ধরনের উদ্যোগ আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী হওয়া প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য গবেষকরা মনে করেন এই প্রবণতা রোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে অহেতুক সিজারিয়ানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রতিটি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য চিকিৎসাগত যৌক্তিকতার লিখিত প্রমাণ রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে স্বাভাবিক প্রসব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হচ্ছে। প্রসবপূর্ব সেবার সময় মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের সুবিধা এবং সিজারিয়ানের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। পরিবারের সদস্যদেরও এই বিষয়ে শিক্ষিত করা প্রয়োজন যাতে তারা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে চাপ না দেন।

প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তাদের পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এই সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণের আধুনিক সুবিধা যুক্ত করতে হবে। এতে মায়েরা সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে উৎসাহিত হবেন এবং বেসরকারি হাসপাতালের বাণিজ্যিক চাপ থেকে রক্ষা পাবেন।

স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা দরকার। বীমা কোম্পানিগুলো যদি অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের খরচ বহন না করে এবং স্বাভাবিক প্রসবে বেশি সুবিধা দেয়, তাহলে এই প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। চিকিৎসকদের পারিশ্রমিক কাঠামোও এমনভাবে ঠিক করা উচিত যাতে স্বাভাবিক প্রসবে তারা উৎসাহিত হন। বর্তমান ব্যবস্থায় সিজারিয়ানে চিকিৎসক বেশি সম্মানী পান, যা নৈতিক চিকিৎসা সেবার পথে বাধা।

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন এবং গাইনোকোলজি বিশেষজ্ঞদের সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের উচিত নৈতিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সদস্যদের মধ্যে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। যেসব চিকিৎসক বাণিজ্যিক স্বার্থে রোগীর স্বাস্থ্যের সাথে আপস করছেন, তাদের বিরুদ্ধে পেশাগত শাস্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। চিকিৎসক সমাজের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা এই সংকট মোকাবেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি চিকিৎসা সিদ্ধান্ত রোগীর কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া উচিত, বাণিজ্যিক লাভ নয়। চিকিৎসকদের প্রথম শপথই হলো রোগীর ক্ষতি না করা। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী। যখন একজন চিকিৎসক আর্থিক লাভের জন্য অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন, তখন তিনি শুধু একটি পরিবারকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেন না, বরং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যকেও ঝুঁকিতে ফেলেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কায় সিজারিয়ানের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে কিছু দেশ সফলভাবে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। নেদারল্যান্ডসে সিজারিয়ানের হার মাত্র ১৭ শতাংশ, কারণ সেখানে মিডওয়াইফ সেবা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা হয়। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে।

গণমাধ্যমও এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের পক্ষে ইতিবাচক বার্তা প্রচার করা উচিত। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা যদি তাদের স্বাভাবিক প্রসবের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, তাহলে সমাজে এর প্রভাব পড়তে পারে। স্বাভাবিক প্রসবকে স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যা প্রকৃতির নিজস্ব প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার, চিকিৎসক সমাজ, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। চিকিৎসা খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। একইসাথে যাদের প্রকৃত প্রয়োজন তাদের জন্য সিজারিয়ান সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এই দ্বৈত লক্ষ্য অর্জন করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারকে এই বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে যেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য স্পষ্ট চিকিৎসাগত নির্দেশনা থাকবে। কোন পরিস্থিতিতে সিজারিয়ান আবশ্যক এবং কোন ক্ষেত্রে তা এড়ানো যায় সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা প্রয়োজন। এই গাইডলাইন মেনে না চললে শাস্তির বিধান রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত নিয়মিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিদর্শন করা এবং সিজারিয়ানের হার পর্যবেক্ষণ করা। যেসব প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক উচ্চহারে সিজারিয়ান করা হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পরিবর্তন আনতে হবে। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের সময় স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দিতে হবে। বর্তমানে অনেক নতুন চিকিৎসক স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনায় যথেষ্ট অভিজ্ঞ নন, ফলে তারা জটিলতার আশঙ্কায় সিজারিয়ানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি এই প্রবণতা কমাতে সাহায্য করবে।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েদের এবং তাদের পরিবারকে সঠিক তথ্য দিতে হবে। স্বাভাবিক প্রসব যে নিরাপদ এবং শিশু ও মায়ের জন্য উপকারী এই বিষয়ে জনগণকে বোঝাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতাদেরও এই সচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রণোদনা কাঠামো পরিবর্তন করাও জরুরি। বর্তমানে যেহেতু চিকিৎসক ও হাসপাতাল উভয়ই সিজারিয়ান থেকে বেশি আর্থিক লাভবান হন, তাই তাদের জন্য বিকল্প প্রণোদনা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। স্বাভাবিক প্রসবে সফলতার জন্য পুরস্কার বা স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এতে চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনায় আরও আগ্রহী হবেন।

কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শুধুমাত্র তখনই নিশ্চিত করা যাবে যে প্রতিটি মা এবং শিশু সবচেয়ে নিরাপদ এবং উপযুক্ত প্রসব সেবা পাচ্ছেন। বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির এই উদ্বেগজনক বৃদ্ধি একটি জটিল সমস্যা, কিন্তু সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। মুনাফাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে মানবিক ও রোগীকেন্দ্রিক সেবা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চিকিৎসা পেশার নৈতিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। একজন চিকিৎসক যেন সবসময় রোগীর কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন, সেই সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি।

মাতৃত্ব একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর প্রক্রিয়া। অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত হস্তক্ষেপ এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বাংলাদেশকে এই বাস্তবতা স্বীকার করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য এই সংকট মোকাবেলা অপরিহার্য। সময় এসেছে সকল পক্ষের একসাথে কাজ করার এবং স্বাভাবিক প্রসবকে আবার স্বাভাবিক করে তোলার।

ট্যাগস:

স্বাস্থ্যমাতৃস্বাস্থ্যসিজারবেসরকারি হাসপাতাল

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন