KOFIPOST

KOFIPOST

কাশি কেন হয় এবং কোন ঔষধ খাবেন? সম্পূর্ণ গাইডলাইন ও ঘরোয়া প্রতিকার

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
কাশি কেন হয় এবং কোন ঔষধ খাবেন? সম্পূর্ণ গাইডলাইন ও ঘরোয়া প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত

কফ একটি সাধারণ শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা যা প্রায় প্রত্যেক মানুষের জীবনে কোনো না কোনো সময় দেখা দেয়। কফ বা শ্লেষ্মা মূলত একটি আঠালো পদার্থ যা আমাদের শ্বাসযন্ত্র ধুলো, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের মতো ক্ষতিকর পদার্থ আটকাতে এবং বের করে দিতে তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

শরীর যখন অত্যধিক কফ উৎপন্ন করে তখন তা ফুসফুসে এবং শ্বাসনালীতে জমা হতে পারে ফলে একটানা কাশি হতে পারে। এই সমস্যাটি শুধুমাত্র শারীরিক অস্বস্তিই নয় বরং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

কফ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত শুকনো কাশি যেখানে কোনো কফ বের হয় না। এটি একটি অ-উৎপাদনশীল কাশি যা সাধারণত জ্বালা বা প্রদাহের কারণে হয় এবং কাশির সময় কোন কফ বা শ্লেষ্মা নিয়ে আসে না। দ্বিতীয়ত ভেজা বা উৎপাদনশীল কাশি যেখানে কফ বের হয়। এর মানে হল যে রোগী তার ফুসফুসের পাশাপাশি ব্রঙ্কিয়াল টিউব থেকে কফ বা শ্লেষ্মা কাশি করছে।

কফের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ যেমন ভাইরাল সংক্রমণ সর্দি ইনফ্লুয়েঞ্জা শ্লেষ্মা উৎপাদন বাড়াতে পারে। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ যেমন ব্রঙ্কাইটিস যক্ষ্মা বা নিউমোনিয়া শ্লেষ্মা ঘন করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের অবস্থা যেমন হাঁপানি শ্বাসনালী প্রদাহ এবং শ্লেষ্মা উত্পাদন বৃদ্ধি করতে পারে। সিস্টিক ফাইব্রোসিস ফুসফুসে ঘন আঠালো শ্লেষ্মা তৈরি করে। পরিবেশগত কারণ যেমন বায়ু দূষণ ধোঁয়া এবং অ্যালার্জেন শ্লেষ্মা উৎপাদন বাড়াতে পারে।

কফ ভেরিয়েন্ট অ্যাজমায় শুষ্ক কাশি ছাড়া অ্যাজমা বা হাঁপানির অন্যান্য প্রচলিত উপসর্গ প্রকাশ পায় না। সাধারণত এ ধরনের কাশি রাতে বেড়ে যায়। ধুলাবালু ফুলের রেণু শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ঠান্ডা বাতাস ইত্যাদি কারণে কাশির প্রকোপ বেড়ে গেলে সেটি সাধারণত অ্যালার্জির সমস্যা।

জিইআরডি নামক পাকস্থলীর অ্যাসিড সমস্যাও কফের একটি কারণ। পাকস্থলীতে নিঃসরিত অ্যাসিড খাদ্যনালির দিকে চলে আসার সমস্যা থেকে কাশিসহ বুকে জ্বালাপোড়া মুখে অম্ল স্বাদ অনুভব হতে পারে। মসলাদার খাবার ভাজা খাবার ক্যাফেইন চকলেট অ্যালকোহল ও টকজাতীয় খাবার খেলে জিইআরডি উদ্দীপ্ত হয়ে থাকে।

দীর্ঘস্থায়ী কাশি আট সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় এবং অ্যালার্জি হাঁপানি বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ এর ফলে হতে পারে। এ ধরনের কাশি শুষ্ক বা টিকলি হতে পারে শ্বাসনালী পরিষ্কার করার জন্য শ্লেষ্মা বা কফ জমে না। ক্রমাগত কাশি শারীরিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে যার মধ্যে পেশী ব্যথা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে এমনকি পাঁজরের ফাটলও হতে পারে।

কফের রঙ ও ধরন দেখে রোগের প্রকৃতি বোঝা যায়। কফ সবুজ হলুদ অথবা রক্তাক্ত হলে বিশেষ করে যদি এটি কয়েক দিনের বেশি স্থায়ী হয় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সাদা বা স্বচ্ছ শ্লেষ্মাজাতীয় কফ সাধারণত অ্যালার্জি বা ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে।

কফের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এক্সপেক্টোরেন্ট শ্লেষ্মা পাতলা করে যখন আপনার কফযুক্ত কাশি থাকে তখন এটি শ্লেষ্মা আলগা করে কাশির মাধ্যমে বের করা সহজ করে দেয়। এটি বুকের কনজেশন দূর করতে সাহায্য করে। গুয়াইফেনেসিন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এক্সপেক্টোরেন্ট উপাদান।

দীর্ঘদিনের কাশি নিরাময়ে চিকিৎসকের পরামর্শে কফ সিরাপ কফের প্রকারভেদে কফ সাপ্রেসেন্ট অথবা এক্সপেক্টোরেন্ট দেওয়া হয় অ্যান্টিহিস্টামিন কর্টিকোস্টেরয়েড ডিকনজেস্ট্যান্ট ইনহেলার অ্যাসিড ব্লকার বা ওমেপ্রাজল সেবন করতে পারেন। তবে যেকোনো ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ঘরোয়া পদ্ধতিতে কফ নিরাময়ে বেশ কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে। লবণ জল বুকের সর্দি ও কফ দূর করতে সবচেয়ে সহজ আর সস্তা উপায়। লবণ শ্বাসযন্ত্র থেকে কফ দূর করতে সাহায্য করে। এক গ্লাস সামান্য উষ্ণ জলের সঙ্গে এক চা চামচ লবণ মিশিয়ে দিনে দুই তিনবার গারগেল করুন। লেবু জলে এক চামচ মধু মিশিয়ে পান করলে মধু শ্বাসযন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে এবং বুক থেকে কফ বা শ্লেষ্মা দূর করে গলা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।

হলুদে থাকা কারকুমিন নামের উপাদান বুক থেকে কফ ও শ্লেষ্মা দূর করে বুকে ব্যথা শ্বাসকষ্ট দ্রুত কমিয়ে দেয়। এর অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান গলা ও বুকের খুসখুসে অস্বস্তি জ্বালা ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে। এক গ্লাস সামান্য উষ্ণ পানিতে এক চিমটে হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে প্রতিদিন গারগেল করুন।

কফ ও শ্লেষ্মা পাতলা করতে তরল খাবার সাহায্য করে। এজন্য দৈনিক পর্যাপ্ত পানি পান করুন। চা স্যুপসহ স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন। গরম পানিতে ইউক্যালিপটাস ও রোজমেরির মতো উদ্ভিদের তেল মিশিয়ে ভাপ নিলে শ্লেষ্মা ঝিল্লিকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করবে।

ইউক্যালিপটাস তেল কাশি কমাতে ও কফ দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকরী। এই তেল বুকে সরাসরি মালিশ করতে পারেন। কয়েক ফোঁটা ইউক্যালিপটাস তেলের ব্যবহারে নাক ও বুকে জমে থাকা কফ দূর করতে পারবেন।

কফ সমস্যা প্রতিরোধে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ধূমপান পরিহার করা বায়ু দূষণ থেকে দূরে থাকা পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। শীতকালে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কারণ এ সময়ে কফের সমস্যা বেশি হয়।

কফের কাশির সাথে প্রচণ্ড জ্বর ঠান্ডা লাগা বা ক্লান্তি আসলে হাঁপানি সিওপিডি বা সিস্টিক ফাইব্রোসিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের ইতিহাস থাকলে এবং লক্ষণগুলি আরও খারাপ হলে অথবা কফের পরিমাণ রঙ বা ধারাবাহিকতায় হঠাৎ বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কফ যদিও একটি সাধারণ সমস্যা তবে এর সঠিক চিকিৎসা না করলে তা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই সময়মত সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে ঘরোয়া প্রতিকার কার্যকর হতে পারে তবে সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

ট্যাগস:

স্বাস্থ্যকাশির ঔষধঘরোয়া উপায়

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন