বাংলাদেশে এলার্জি রোগী কেন বাড়ছে? এলার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর উপায়
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ৫:৫৭ এএম

এলার্জি বর্তমান সময়ে একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যা যা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ জনসংখ্যা বিভিন্ন ধরনের এলার্জিক ব্যাধিতে ভুগছেন এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিশু এবং তরুণদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বিশেষভাবে লক্ষণীয় যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলার্জি মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অস্বাভাবিক এবং অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া। যখন আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম কোনো নিরীহ এবং সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন পদার্থকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন এলার্জি হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ফলে শরীরে হিস্টামিন এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয় যা বিভিন্ন উপসর্গের সৃষ্টি করে। যেসব পদার্থ এলার্জির কারণ হয় সেগুলোকে এলার্জেন বলা হয় যা খাদ্য, ধুলাবালি, ফুলের রেণু, পোষা প্রাণীর লোম বা বিভিন্ন ওষুধ থেকে আসতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের এলার্জি রয়েছে যা মানুষকে আক্রান্ত করে। খাদ্যজনিত এলার্জি বাংলাদেশে একটি বিশেষ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু খাবার গ্রহণের পর শরীরে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে গরুর মাংস সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত এলার্জেন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যেখানে ৬৭ শতাংশ উত্তরদাতা একে এলার্জেনিক খাদ্য বলে মনে করেন। এছাড়া বেগুন ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ, ইলিশ মাছ ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং চিংড়ি ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ সাধারণত রিপোর্ট করা হয়েছে। ডিম, দুধ, বাদাম এবং কিছু ফলমূলও খাদ্যজনিত এলার্জির সাধারণ উৎস।
শ্বাসতন্ত্রের এলার্জি আরেকটি প্রধান ধরন যেখানে ধুলাবালি, ফুলের রেণু, ছত্রাক, পশুর লোম এবং বাতাসে ভাসমান অন্যান্য কণা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ত্বকের এলার্জি সাবান, প্রসাধনী, রাসায়নিক পদার্থ এবং কিছু কাপড়ের সংস্পর্শে আসার ফলে হতে পারে। ওষুধজনিত এলার্জি বিশেষত পেনিসিলিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক এবং কিছু ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষেত্রে দেখা যায়। পোকামাকড়ের কামড় বা হুল ফোটানোর ফলেও তীব্র এলার্জিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এলার্জির উপসর্গ নির্ভর করে কোন ধরনের এলার্জি হয়েছে তার ওপর। সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, চোখ চুলকানো এবং লাল হওয়া, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট। ত্বকের এলার্জিতে চুলকানি, লাল ফুসকুড়ি, ফোলাভাব এবং কখনও কখনও জলপূর্ণ গুটি দেখা যায়। খাদ্যজনিত এলার্জির ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, মুখ ও গলা ফুলে যাওয়া এবং কখনও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কখনো কখনো মাথা ব্যথাও এলার্জির একটি উপসর্গ হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যানাফাইল্যাক্সিস নামে একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে যেখানে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়, শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে শ্বাসকষ্ট হয় এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে এলার্জির হার বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা যায়। পরিবেশ দূষণ প্রধান একটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলোতে বায়ুদূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এটি এলার্জির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। পার্টিকুলেট ম্যাটার যেমন পিএম২ দশমিক ৫ এবং পিএম১০, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটার ধুলা, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং শিল্পকারখানার নির্গত বিষাক্ত পদার্থ বাতাসে মিশে মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করছে। এই দূষিত বায়ু নাসিকার মিউকোসায় জ্বালাতন সৃষ্টি করে এবং এলার্জিক প্রতিক্রিয়া আরও খারাপ করে। দীর্ঘমেয়াদী এক্সপোজার দীর্ঘস্থায়ী নাসিকা প্রদাহ, বৃদ্ধি পাওয়া সংবেদনশীলতা এবং হাঁপানির লক্ষণগুলোকে আরও তীব্র করতে পারে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং শহরায়ণ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সমাজগুলো যত বেশি সমৃদ্ধ এবং নগরায়িত হচ্ছে এলার্জির প্রকোপ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহুরে জীবনে মানুষ এখন বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে কাটায় যেখানে এয়ার কন্ডিশনার, কার্পেট এবং পর্দায় ধুলা ও মাইট জমা হয়। এই মাইট এলার্জির অন্যতম প্রধান কারণ। আধুনিক বাসাবাড়ির ঘনবদ্ধ পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত বায়ুচলাচলের অভাব এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলছে। তামাকের ধোঁয়ার মতো ঘরের ভেতরের এবং বাইরের দূষণ পরিবেশগত ঝুঁকির কারণগুলো বৃদ্ধি পাওয়া এবং জৈব বৈচিত্র্য হ্রাস পাওয়াও এই প্রকোপ বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মানুষ এখন কৃত্রিম খাবার, ফাস্ট ফুড এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাচ্ছে যেগুলোতে রং, সংরক্ষক এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এসব পদার্থ অনেক সময় এলার্জির কারণ হতে পারে। বর্তমানে অনেক শিশুই অতিরিক্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেড়ে উঠছে যেখানে তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভিন্ন জীবাণুর সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায় না। হাইজিন হাইপোথিসিস অনুযায়ী শৈশবে বিভিন্ন জীবাণুর সংস্পর্শে আসা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে বিকশিত হতে সাহায্য করে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতার কারণে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং শরীর নিরীহ পদার্থকেও শত্রু মনে করে আক্রমণ করছে।
বংশগত কারণও এলার্জির জন্য দায়ী। পরিবারে যদি বাবা-মায়ের এলার্জি থাকে তবে সন্তানদের এলার্জি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটোপিক প্রবণতা বংশগতভাবে বাহিত হয় এবং এমন মানুষদের শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ইমিউনোগ্লোবিউলিন ই তৈরি করে যা এলার্জিক প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী।
জলবায়ু পরিবর্তনও এলার্জি বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হওয়ার সাথে সাথে এলার্জি মৌসুম আরও তীব্র হয়ে উঠছে, আগে শুরু হচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং মানুষ উচ্চ মাত্রার পরাগরেণুর সংস্পর্শে আসছে। বিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তনগুলোকে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইড স্তরের সাথে যুক্ত করেছেন যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটায় এবং উদ্ভিদ বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। র্যাগউইড এবং ঘাসের মতো উদ্ভিদ এখন আরও বেশি পরাগরেণু উৎপাদন করছে এবং নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে। প্রোসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশব্যাপী পরাগরেণুর মাত্রা ২১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফুলের রেণুর মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং বাতাসে ভাসমান রেণুর পরিমাণ বাড়ছে। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বৃদ্ধির ফলে ছত্রাক এবং মাইটের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে যা এলার্জিক রাইনাইটিস এবং অ্যাজমার কারণ হতে পারে।
প্রসাধনী এবং রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধিও এলার্জির অন্যতম কারণ। বিভিন্ন সাবান, শ্যাম্পু, ক্রিম, মেকআপ পণ্য, কীটনাশক এবং পরিষ্কারের রাসায়নিক দ্রব্যে থাকা উপাদান ত্বকের এলার্জি এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে অনেক সময় নিম্নমানের প্রসাধনী পণ্য ব্যবহার করা হয় যেগুলোতে ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে।
পরিবেশগত কারণের পাশাপাশি অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা নিতে অবহেলা এই রোগের ক্রমবর্ধমান প্রকোপের দিকে পরিচালিত করছে। বাংলাদেশে অনেক ইনডোর, আউটডোর, পেশাগত এবং খাদ্য এলার্জেন রয়েছে যা এলার্জি সৃষ্টি করে। চিকিৎসা সুবিধার উন্নতির ফলে এখন আগের চেয়ে বেশি মানুষ এলার্জি শনাক্ত করতে পারছে। আগে অনেক মানুষ এলার্জির উপসর্গকে সাধারণ সর্দি-কাশি মনে করতেন এবং চিকিৎসা নিতেন না। কিন্তু এখন সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এবং পরীক্ষার সুবিধা বৃদ্ধির কারণে এলার্জি সঠিকভাবে শনাক্ত হচ্ছে।
এলার্জি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রোগ নির্ণয়ের সুবিধা এখনও বেশিরভাগ রোগীর জন্য ইতিহাস এবং ক্লিনিকাল পরীক্ষার উপর নির্ভরশীল। স্কিন প্রিক টেস্ট এবং আইজিই অনুমান রাজধানী ঢাকার বাইরে পাওয়া যায় না এবং এগুলো ব্যয়বহুলও। এলার্জি পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে কোন কোন পদার্থে এলার্জি রয়েছে। স্কিন প্রিক টেস্ট এবং রক্ত পরীক্ষা এই ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
এলার্জির প্রতিকারের প্রথম এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এলার্জেন এড়িয়ে চলা। যদি কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা পদার্থে এলার্জি থাকে তবে সেটি এড়িয়ে চলতে হবে। ধুলাবালি থেকে এলার্জি থাকলে মাস্ক ব্যবহার করা, নির্দিষ্ট খাবারে এলার্জি থাকলে সেই খাবার পরিহার করা এবং পোষা প্রাণীর লোমে এলার্জি থাকলে পোষা প্রাণী থেকে দূরে থাকা উচিত।
ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ধুলাবালি কমানো জরুরি। নিয়মিত বিছানার চাদর, বালিশের কভার এবং পর্দা ধোয়া উচিত। কার্পেট ব্যবহার কমিয়ে মেঝে মুছে পরিষ্কার রাখা ভালো। ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে আর্দ্রতা এবং ছত্রাক জমতে না পারে। পোষা প্রাণী থেকে এলার্জি হলে সেগুলোকে শোবার ঘর থেকে দূরে রাখা উচিত।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক এবং তাজা খাবার খাওয়া উচিত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি এবং ফলমূল খাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি যুক্ত খাবার এলার্জির বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
ওষুধের মাধ্যমে এলার্জির উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় যা হিস্টামিনের কার্যকারিতা বন্ধ করে উপসর্গ কমায়। এই ওষুধগুলো এলার্জির লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর এবং প্রয়োজনে লক্ষণ শুরু হওয়ার আগেও সেবন করা যেতে পারে। নাক বন্ধ হয়ে গেলে নেজাল স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে যা স্থানীয় উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। চোখের ড্রপও স্থানীয় উপসর্গ কমাতে কার্যকর। অ্যাজমার ক্ষেত্রে ইনহেলার ব্যবহার করা হয়। গুরুতর এলার্জির ক্ষেত্রে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে যা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে।
ইমিউনোথেরাপি বা এলার্জি শট দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে। এই পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে এলার্জেনের ক্ষুদ্র মাত্রা শরীরে প্রবেশ করানো হয় যাতে শরীর ধীরে ধীরে সেই পদার্থের প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠে। সাবলিঙ্গুয়াল ট্যাবলেট এলার্জেনের প্রতি ইমিউন সিস্টেমকে ধীরে ধীরে ডিসেনসিটাইজ করে দীর্ঘমেয়াদী উপশম প্রদান করতে পারে। এটি বিশেষত পরাগজনিত এলার্জি, পোকামাকড়ের হুলের এলার্জি এবং গুরুতর বা অবিরাম এলার্জি আছে এমন ব্যক্তিদের জন্য উপকারী।
প্রাকৃতিক চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে স্যালাইন নেজাল রিন্স যা এলার্জেন বের করে দেয় এবং নাসিকাপথ পরিষ্কার করে। বাষ্প শ্বাস নেওয়া নাক বন্ধ হওয়া কমাতে এবং জ্বালাতন্ত্রী টিস্যু প্রশমিত করতে সাহায্য করে। স্থানীয় মধু খাওয়া স্থানীয় পরাগরেণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ক্যামোমাইল এবং আদা চা প্রদাহ কমাতে পারে।
মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম এলার্জি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এবং এলার্জির উপসর্গ বাড়াতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম এবং যোগব্যায়াম শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এলার্জি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। যাদের মারাত্মক এলার্জি রয়েছে তাদের সবসময় এপিনেফ্রিন ইনজেক্টর সঙ্গে রাখা উচিত। অ্যানাফাইল্যাক্সিসের ক্ষেত্রে দ্রুত এপিনেফ্রিন ব্যবহার এবং হাসপাতালে নেওয়া প্রাণ বাঁচাতে পারে।
সচেতনতা বৃদ্ধি এলার্জি মোকাবিলার অন্যতম হাতিয়ার। নিজের এলার্জি সম্পর্কে জানা এবং পরিবার ও বন্ধুদের জানানো জরুরি। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকদের জানানো উচিত যাতে প্রয়োজনে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ শিল্পে খাদ্য এলার্জি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে রেস্তোরাঁ কর্মীদের খাদ্য এলার্জি সম্পর্কে ভাল ভিত্তিগত জ্ঞান ছিল কিন্তু মনোভাব উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা দেখিয়েছে। মনোভাব জ্ঞানের চেয়ে খাদ্য এলার্জি ব্যবস্থাপনা অনুশীলনকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে বিশেষত গ্রাহক যোগাযোগ এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে। এজন্য রেস্তোরাঁয় ব্যাপক খাদ্য এলার্জি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মনোভাব উন্নতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এলার্জির চিকিৎসা সুবিধা উন্নত হচ্ছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে এলার্জি বিশেষজ্ঞ এবং আধুনিক পরীক্ষার সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। তবে গ্রামীণ এলাকায় এখনও সচেতনতা এবং চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিবেশ সুরক্ষা দীর্ঘমেয়াদে এলার্জি কমাতে সাহায্য করবে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং রাসায়নিক পদার্থের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এলার্জেনের মাত্রা কমাতে পারে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবাই নিজ নিজ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে অবদান রাখতে পারে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া কমানো, ইটভাটার আধুনিকীকরণ এবং নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
এলার্জি প্রতিরোধের জন্য কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। বাড়িতে নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ধুলাবালি কম রাখা, বায়ু দূষণ এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং পরোক্ষ ধূমপান থেকেও দূরে থাকা উচিত। রাসায়নিক পরিষ্কারক ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকতে হবে এবং সম্ভব হলে প্রাকৃতিক বিকল্প ব্যবহার করা ভালো।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। শিশুদের খাবার প্রথমবার দেওয়ার সময় অল্প পরিমাণে দিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা উচিত। যদি পরিবারে এলার্জির ইতিহাস থাকে তবে শিশুদের ক্ষেত্রে আরও সাবধান হতে হবে। মায়ের বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এলার্জির ঝুঁকি কমায়।
আবহাওয়া এবং মৌসুমভিত্তিক সতর্কতাও জরুরি। বসন্তকালে যখন ফুলের রেণু বাতাসে বেশি থাকে তখন বাইরে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। বর্ষাকালে ঘরে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ছত্রাক বৃদ্ধি রোধ করা গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে বায়ুদূষণ বেশি থাকে তাই এই সময় বিশেষ সতর্কতা দরকার।
এলার্জি ডায়েরি বা রেকর্ড রাখা সহায়ক হতে পারে। কখন এলার্জির উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, কী খাওয়া হয়েছে, কোথায় গিয়েছিলেন এসব তথ্য লিখে রাখলে এলার্জেন চিহ্নিত করতে সুবিধা হয়। এই তথ্য চিকিৎসককে দেখানো গেলে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় সাহায্য হয়।
কর্মক্ষেত্রে এলার্জি প্রতিরোধও গুরুত্বপূর্ণ। যারা রাসায়নিক পদার্থ, ধুলা বা অন্যান্য এলার্জেনের সংস্পর্শে আসেন তাদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত। কারখানা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ বায়ুচলাচল ব্যবস্থা থাকা দরকার। পেশাগত এলার্জি একটি গুরুতর সমস্যা যা কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এলার্জি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হলেও সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত চিকিৎসা। বাংলাদেশে এলার্জি সমস্যা মোকাবেলায় সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতেরই সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব যদি সঠিক ব্যবস্থাপনা করা যায়। সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং সময়মতো চিকিৎসা এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে এলার্জি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এলার্জি সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করা দরকার। অনেক সময় ভুল তথ্য এবং কুসংস্কারের কারণে মানুষ সঠিক চিকিৎসা নেয় না। স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম স্কুল-কলেজে চালু করা যেতে পারে যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এলার্জি সম্পর্কে সচেতন হয়। কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে এলার্জি সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ফার্মেসি এবং ওষুধ বিক্রেতাদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন যাতে তারা সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন। অনেক সময় মানুষ সরাসরি ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কিনে খান যা বিপজ্জনক হতে পারে। ওষুধ বিক্রেতাদের এলার্জির ওষুধ বিক্রি করার সময় সতর্কতামূলক তথ্য দেওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা উচিত।
এলার্জি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন এলার্জেন বেশি সমস্যা সৃষ্টি করছে, কোন এলাকায় কোন ধরনের এলার্জি বেশি দেখা যাচ্ছে এসব বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন এবং চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে এলার্জির বাড়ন্ত হার উদ্বেগজনক হলেও সমন্বিত এবং সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যন্ত সকল স্তরে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এলার্জির প্রকোপ কমানো যাবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা যাবে।
ট্যাগস:
স্বাস্থ্যকফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন