KOFIPOST

KOFIPOST

দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমানোর উপায়

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমানোর উপায়

আধুনিক জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন আমরা এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হই যা আমাদের মানসিক প্রশান্তিতে আঘাত হানে। কিন্তু এই মানসিক অশান্তির পেছনে কী কারণ রয়েছে এবং কীভাবে তা আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, সেই বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

মানসিক অশান্তির মূল কারণ হলো বর্তমান বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা। অর্থাৎ দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত থাকা। চিন্তাভাবনা এবং মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন চিন্তাগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায়, তখন তা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। এভাবেই সাধারণ চিন্তা দুশ্চিন্তায় রূপান্তরিত হয় এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

মানসিক চাপ শুধুমাত্র মনের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্ট্রেসের কারণে মাথাব্যথা, পেটে অস্বস্তি এবং ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, মানসিক চাপ আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। যখন আমরা মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করি, তখন খাবারের প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। কখনো চকোলেট বা পিৎজার মতো ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা জাগে, আবার কখনো কিছুই খেতে মন চায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্ট্রেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক রাজিতা সিনহা ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোনো কঠিন এবং বিহ্বলকর পরিস্থিতিতে যখন মনে হয় আর কিছুই করার নেই, তখন শরীর এবং মন যে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে সেটিই মূলত স্ট্রেস বা মানসিক চাপ। তিনি জানান, আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি, উদ্বেগ এবং শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তন যেমন তীব্র ক্ষুধা বা তৃষ্ণা মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে সক্রিয় করে তোলে। হাইপোথ্যালামাস হলো মস্তিষ্কের একটি ক্ষুদ্র অংশ যা আকারে মোটরের মতো।

অধ্যাপক সিনহা আরও বলেন যে, এই অ্যালার্ম সিস্টেম শরীরের প্রতিটি কোষের ওপর প্রভাব ফেলে এবং অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোনকে সক্রিয় করে। ফলস্বরূপ হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। স্বল্পমেয়াদি মানসিক চাপ অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। যেমন, এটি বিপদ থেকে দ্রুত সরে আসতে বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো কাজ সম্পন্ন করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ অত্যন্ত ক্ষতিকারক বলে সতর্ক করেছেন অধ্যাপক সিনহা। তিনি উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকলে ডিপ্রেশন, ঘুমের সমস্যা এবং ওজন বৃদ্ধির মতো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্ট্রেস ক্ষুধার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। কখনো এটি ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়, আবার কখনো একেবারে দমিয়ে ফেলে। এমনটি ঘটার কারণ হলো আমাদের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সিস্টেম, অর্থাৎ পেট ও অন্ত্র এবং মস্তিষ্কের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

অধ্যাপক সিনহা ব্যাখ্যা করেন যে, মানসিক চাপ ভেগাস নার্ভের কার্যকলাপকে দমিয়ে দিতে পারে। এই স্নায়ু ব্রেনস্টেম থেকে পেট পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর কাজ হলো পাকস্থলী থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠিয়ে জানানো যে পেট কতটা পূর্ণ এবং শরীরের কতটা শক্তি প্রয়োজন। যখন শরীর মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়, তখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ইনসুলিনকে স্বল্পসময়ের জন্য কম কার্যকর করে তোলে।

প্রকৃতপক্ষে গ্লুকোজ শরীরে ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে রক্তে জমা হতে থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রাকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপে ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ইনসুলিন প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে ওজন বৃদ্ধি বা ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে।

চিকিৎসক ডা. স্টোরোনি জানান, মানসিক চাপে থাকাকালীন অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া বা স্ট্রেস ইটিং কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম পরিকল্পনা করা। এতে ব্যস্ত সময়ে আমরা অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারব। তিনি বিশেষভাবে ঘুমের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। কারণ ঘুম মানসিক চাপের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তিনটি প্রধান অঙ্গকে পুনরায় সক্রিয় করে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।

ডা. স্টোরোনি আরও বলেন, ঘুম মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি এবং অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলোকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনে, যার ফলে স্ট্রেস হরমোন তৈরি হওয়া বন্ধ হয়। ঘুমের ঘাটতি হলে সব ধরনের খাবারের প্রতি আকর্ষণ, বিশেষত মিষ্টি খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। এর কারণ ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্কের অধিক শক্তির প্রয়োজন পড়ে। তিনি জানান, নিয়মিত ব্যায়াম করলে মানসিক চাপ থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও উন্নত হয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে এমন পরিস্থিতি যদি আসন্ন হয়, তাহলে এই সাধারণ বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ দিলে অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া এড়ানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস মানসিক চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্যাগস:

মানসিক চাপটিপসস্বাস্থ্যলাইফ স্টাইল

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন