বাংলা
“বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘পুঁইমাচা’ সন্তান বাৎসল্যের একখানা প্রামাণ্য দলিল” —এ উক্তির আলোকে অন্নপূর্ণার চরিত্র বিশ্লেষণ কর
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১০ নভেম্বর ২০২৫, ৩:৫৬ পিএম

ভূমিকা
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামীণ বাংলার জীবন ও প্রকৃতির এক নিপুণ শিল্পী। তাঁর 'পুঁইমাচা' গল্পটি নিছক একটি পারিবারিক আখ্যান নয়, বরং চরম দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ এবং সর্বোপরি এক মায়ের আত্মগোপনকারী বাৎসল্যের এক মর্মস্পর্শী দলিল। আলোচ্য উক্তিটি (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘পুঁইমাচা’ সন্তান বাৎসল্যের একখানা প্রামাণ্য দলিল) এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অন্নপূর্ণা চরিত্রটির গুরুত্বকে নির্দেশ করে। আপাতদৃষ্টিতে কঠোর ও বাস্তববাদী এই নারীটি কীভাবে দারিদ্র্যের কষাঘাতেও নিজের মাতৃত্বকে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, অন্নপূর্ণার চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা সেই বাৎসল্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন করব।
বাস্তবতার কষ্টিপাথরে কর্তব্যবোধ
অন্নপূর্ণা চরিত্রটি হলো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের কঠোর বাস্তবের প্রতীক। স্বামীর উদাসীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে সংসারের সমস্ত ভার তাঁকে একাই বহন করতে হয়েছে। তাঁর স্বামী সহায়হরি চাটুয্যের প্রতি তাঁর বিরক্তি বা ক্রোধ কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়, বরং তিন কন্যার ভবিষ্যতের প্রতি এক গভীর দুশ্চিন্তার প্রতিচ্ছবি। তিনি সমাজের চোখে একঘরে হওয়ার ভয় পান এবং মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে সদা উদ্বিগ্ন থাকেন। বিশেষত, বড় মেয়ে ক্ষেন্তির বয়স বেড়ে যাওয়ায় তার বিবাহ নিয়ে তাঁর আকাশছোঁয়া চিন্তা কেবল একজন কর্তব্যপরায়ণ গৃহকর্ত্রীর নয়, এটি সেই মা'য়ের পরিচয় যিনি তাঁর সন্তানদের সমাজে মাথা উঁচু করে দেখতে চান। তাঁর এই কঠোর বাস্তবজ্ঞান ও কর্তব্যবোধই তাঁর বাৎসল্যের প্রাথমিক ভিত্তি।
কঠোরতার আবরণে গোপন বাৎসল্য
অন্নপূর্ণার চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী দিকটি হলো তাঁর আপাত কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপার স্নেহ। গল্পে যখন ক্ষেন্তি সামান্য পুঁইশাক ও কুচো চিংড়ি চেয়ে এনেছিল, তখন অভাবের তাড়নায় এবং সমাজের চোখরাঙানির ভয়ে অন্নপূর্ণা ক্ষেন্তিকে তীব্র বকুনি দিয়ে তা ফেলে দিতে বাধ্য করেন। এই ঘটনায় তাঁর কঠোর রূপটিই প্রথমে চোখে পড়ে। কিন্তু, বিভূতিভূষণ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে এই কঠোরতা তাঁর নিরুপায়তার ফল; তিনি চান না যে তাঁর মেয়ে পিতার অকর্মণ্যতার জন্য অপদস্থ হোক বা সমাজের চোখে 'উচ্ছিষ্ট-ভোগী' হিসেবে চিহ্নিত হোক। অন্নপূর্ণার এই সিদ্ধান্তের মূল কারণগুলি হলো:
- দারিদ্র্যজনিত আত্মসম্মান: তিনি চান না অভাবের কারণে তাঁর মেয়েরা সমাজে ছোট হোক।
- সামাজিক শঙ্কা: একঘরে হওয়ার ভয় এবং সমাজের সমালোচনা থেকে পরিবারকে রক্ষা করা।
- স্বার্থত্যাগ: নিজের স্নেহের ইচ্ছাকে দমন করে সন্তানের সম্মান রক্ষা করা।
পরবর্তী দৃশ্যে দেখা যায়, যখন বাড়িতে কেউ নেই, তখন তিনি গোপনে ফেলে দেওয়া সেই পুঁইশাক কুড়িয়ে এনে রান্না করেন। এই গোপন রান্নাটি হলো তাঁর বাৎসল্যের চরম প্রমাণ। তিনি নিজের রাগ ও কঠোরতার বাঁধ ভেঙে গোপনে তাঁর প্রিয় কন্যার পছন্দের খাবার তৈরি করে তাকে তৃপ্তি দিতে চেয়েছিলেন, যা উক্তিটির সার্থকতাকে প্রতিষ্ঠা করে।
পুঁইমাচা- নিঃশব্দ শোক ও স্মৃতিচিহ্ন
ক্ষেন্তির বিবাহের পর তার শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হওয়া এবং বসন্ত রোগে অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনাটি অন্নপূর্ণার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি। এই ঘটনা তাঁর মাতৃ-হৃদয়কে নিঃশব্দ শোকে আচ্ছন্ন করে তোলে। গল্পের শিরোনামে থাকা পুঁইমাচাটি এখানে কেবল একটি লতানো গাছ নয়, এটি হয়ে ওঠে অন্নপূর্ণার মৃত কন্যার এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন। যখন পুঁইগাছটি মাচা জুড়ে বেড়ে ওঠে, তখন সেই পুঁইমাচা অন্নপূর্ণার কাছে ক্ষেন্তির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার এক স্থায়ী স্মারক হয়ে ওঠে। গল্পে একটি বিশেষ মুহূর্তে, যখন পিঠে তৈরির সময় ছোট মেয়ে পুঁটি সরলভাবে বলে ওঠে, "দিদি বড় ভালোবাসতো," তখন অন্নপূর্ণার নীরব হাহাকার ও বাৎসল্যের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে। এই নীরব বেদনা থেকেই বোঝা যায়, সন্তানের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল কতটা গভীর, অব্যক্ত এবং আত্মিক।
উপসংহার
বিভূতিভূষণের 'পুঁইমাচা' গল্পের অন্নপূর্ণা চরিত্রটি শুধু এক দরিদ্র মা নন, তিনি হলেন সেই শাশ্বত মাতৃত্বের প্রতিচ্ছবি যা প্রতিকূলতার সামনেও নিজের সন্তানদের মঙ্গলকামনা থেকে এক চুলও সরে না আসে। অভাব, স্বামীর দায়িত্বহীনতা ও সমাজের চাপ - এই সবকিছুর সঙ্গে সংগ্রাম করেও তিনি তাঁর মাতৃত্বের ধর্ম পালন করে গেছেন। তাঁর প্রকাশ্য কঠোরতা বা গোপন বাৎসল্যের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল সন্তানের কল্যাণের জন্য উৎসারিত। ক্ষেন্তির প্রতি তাঁর গভীর ও অব্যক্ত স্নেহ-মমতার এই আখ্যান নিঃসন্দেহে সন্তান বাৎসল্যের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবে।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন