রাষ্ট্রবিজ্ঞান
আধুনিক রাষ্ট্রের পাঁচটি আর্থসামাজিক কার্যাবলী উল্লেখ কর
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৩:১৮ পিএম

ভূমিকা
রাষ্ট্রের ধারণা কালের পরিক্রমায় ব্যাপক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাষ্ট্র যেখানে মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সামগ্রিক কল্যাণে নিবেদিত একটি জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ শতকের শুরু থেকেই রাষ্ট্র শুধু নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে নয়, বরং সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আধুনিক রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক কার্যাবলি অত্যন্ত বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক ভূমিকা
আধুনিক রাষ্ট্র জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এই ভূমিকা কেবল প্রশাসনিক সেবা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে নিয়মিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে।
- ১. শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে আধুনিক রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সকল স্তরে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র জাতীয় সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে সচেষ্ট থাকে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা প্রসারে বৃত্তি প্রদান, উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং বিশেষায়িত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। একটি শিক্ষিত জাতি গঠন কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নেই সহায়ক নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
- ২. স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা, বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি, টিকাদান কর্মসূচি এবং মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য মোবাইল ক্লিনিক, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার এবং টেলিমেডিসিন সেবা চালু করা হয়েছে।
- ৩. দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করে রাষ্ট্র। এছাড়া দুর্যোগকালীন পুনর্বাসন, ত্রাণ বিতরণ এবং আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
- ৪. নারী ও শিশু উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ রোধ, শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ এবং শিশু অধিকার সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। নারীদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান সুযোগ, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি এবং শিশুদের জন্য পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালনা রাষ্ট্রের নিয়মিত কাজের অংশ।
- ৫. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে। অবকাঠামো উন্নয়ন যেমন সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্পায়ন, কৃষি উন্নয়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, রপ্তানি সহায়তা প্রদান এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহিত করা, ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা এবং স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তা প্রদান আধুনিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ।
উপসংহার
আধুনিক রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক কার্যাবলি আজ কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি সুস্থ, শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে অপরিহার্য। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হয় যখন এসব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ লাভ করে। ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে এসব আর্থসামাজিক দায়বদ্ধতা আরও শক্তিশালীভাবে পালন করতে হবে।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন