রাষ্ট্রবিজ্ঞান
জাতীয়তাবাদের উপাদান কী কী?
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ১:১৮ পিএম

ভূমিকা
জাতীয়তাবাদ একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই বিশেষ অনুভূতি যা তাদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়। কোনো সাধারণ জনসমাজ যখন নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই তারা জাতীয় জনসমাজে রূপান্তরিত হয়। এই উপাদানগুলো মূলত দুই ধরনের হতে পারে, বাহ্যিক ও ভাবগত। ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে মানসিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক চেতনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপাদানগুলো একটি জাতির পরিচয় নির্মাণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি জাতির ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলোর প্রভাব ভিন্ন মাত্রায় কাজ করলেও সব মিলিয়ে তারা জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা করে।
জাতীয়তাবাদের বাহ্যিক উপাদান
ভৌগোলিক ঐক্য জাতীয়তার অন্যতম প্রধান বাহ্যিক উপাদান। একই ভূখণ্ডে দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সহযোগিতা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে ওঠে। এই ভূখণ্ডগত সংলগ্নতা জনগণের মধ্যে এমন নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করে যে তারা বিচ্ছিন্নতার কথা ভাবতেই পারে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিভক্তি এবং বাংলাদেশের জন্ম প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা কীভাবে জাতীয় ঐক্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্যালেস্টাইনে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পূর্বে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের দৃঢ় জাতীয়তাবোধ প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক ঐক্য ছাড়াও জাতি গঠন সম্ভব।
বংশগত ঐক্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান যেখানে রক্তের বন্ধন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যখন কোনো জনসমাজ বিশ্বাস করে যে তাদের শিরা-উপশিরায় একই রক্ত প্রবাহিত এবং তাদের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অভিন্ন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি জাগ্রত হয়। তবে আধুনিক যুগে বংশগত অভিন্নতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ইংরেজ, হল্যান্ড, জার্মান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো বিভিন্ন বংশোদ্ভূত মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হলেও শক্তিশালী জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ। অন্যদিকে, একই কুল থেকে উৎপন্ন আরবরা সাউদি, মিশরি, লিবীয় ও সিরীয় হিসেবে পৃথক জাতিগত পরিচয় বহন করে।
ভাষাগত ঐক্য জাতীয়তার একটি অত্যন্ত কার্যকর উপাদান। ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম এবং একই ভাষাভাষী মানুষ সহজেই একে অপরকে বুঝতে পারে। তাদের চিন্তা, চেতনা ও আবেগের সাদৃশ্যের কারণে তারা নিজেদের অন্য জাতি থেকে পৃথক মনে করে এবং তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছিল এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ সুগম করেছিল।
ধর্মীয় ঐক্যও জাতীয়তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি জনসমাজের আচার-ব্যবহার, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধের সবকিছুতেই ধর্মের প্রভাব থাকে। যখন ধর্মীয় অনুভূতি প্রবল হয়, তখন সেই জনসম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য সহজেই গড়ে ওঠে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মের প্রাধান্য ছিল অপরিসীম। তবে ধর্মই জাতীয়তার একমাত্র নিয়ামক নয়। পাকিস্তানের উভয় অংশ ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীনতা লাভ করলেও অন্যান্য উপাদানের অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়।
ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্য জাতি গঠনে অত্যন্ত সহায়ক। দীর্ঘদিন একটি ভূখণ্ডে বসবাসের ফলে জনসমাজের মধ্যে ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সমন্বয়সাধন হয় এবং ঐতিহ্যগত ঐক্য গড়ে ওঠে। পূর্বসূরিদের অতীত কার্যকলাপ, সাহসিকতা ও শৌর্যবীর্য পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রেরণা এবং গৌরবের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। রামজে ম্যুর ও জন স্টুয়ার্ট মিল ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্যবোধকে জাতীয়তার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
জাতীয়তাবাদের ভাবগত ও অর্থনৈতিক উপাদান
অর্থনৈতিক স্বার্থ জাতীয়তার একটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী উপাদান। মার্কসবাদীদের মতে সমান অর্থনৈতিক স্বার্থ ভাষাগত বা ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার করে জনসমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে। অর্থনৈতিক বঞ্চনা, শোষণ ও বৈষম্য জাতীয় জনসমাজকে অধিকার আদায়ে এবং আত্মনির্ভর হতে প্রেরণা জোগায়। পাকিস্তানি শাসকদের একচেটিয়া শোষণ এবং দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে বিরাজমান অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। রাজনৈতিক চেতনা জাতীয়তা গঠন ও বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে কারণ এর মাধ্যমেই অন্যান্য উপাদানগুলো জনগণের অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
ভাবগত ঐক্য জাতীয়তার একটি অপরিহার্য মনোগত উপাদান। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রেনার মতে জাতীয় জনসমাজ সম্পর্কে ধারণা মূলত ভাবগত। বিভিন্নমুখী বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও মানসিকভাবে একত্রে ও ঐক্যবদ্ধভাবে জীবনযাপনের অভিলাষই জাতীয়তা নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। কানাডার জনগণের মধ্যে ভাষা ও বর্ণের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভাবগত ঐক্যের কারণেই তারা একটি জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ। একই আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং একত্রে বসবাসের আন্তরিক ইচ্ছা ছাড়া অভিন্ন ভাষা, ধর্ম বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনোটিই মানবসমাজকে প্রকৃত ঐক্যে আবদ্ধ করতে পারে না। অধ্যাপক স্পেংলার বলেন, জাতীয়তার মূল উপাদান কুলগত বা ভাষাগত ঐক্য নয় বরং মনোগত ঐক্য।
উপসংহার
জাতীয়তা গঠনে কোনো একক উপাদানের গুরুত্ব যেমন চূড়ান্ত নয়, তেমনি সব উপাদানের সমন্বয়েই তা শক্তিশালী রূপ লাভ করে। ভৌগোলিক অবস্থান, বংশগত পরিচয়, ভাষা, ধর্ম, ঐতিহ্য থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক চেতনা সবকিছুই জাতীয়তার বিভিন্ন মাত্রা তৈরি করে। তবে বর্তমান বিশ্বমানবতার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ভাবগত ঐক্য না থাকলে শুধুমাত্র বাহ্যিক উপাদানের সক্রিয়তায় জাতীয়তার অবিনাশী ভাবধারা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। প্রতিটি জাতির নিজস্ব পথ ও বৈশিষ্ট্য আলাদা হলেও এই উপাদানগুলোর সমন্বয়েই তারা স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নির্মাণ করে এবং বিশ্বের বুকে নিজেদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন