KOFIPOST

KOFIPOST

রাষ্ট্রবিজ্ঞান

বঙ্গভঙ্গ কী? পটভূমি ও প্রভাব

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
বঙ্গভঙ্গ কী? পটভূমি ও প্রভাব

ভূমিকা

বাংলার রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ইতিহাসের পাতায় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ একটি সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের শাসনামলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিশাল এই জনপদকে দ্বিখণ্ডিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে। মূলত শাসনকার্যের জটিলতা নিরসন এবং সুশাসনের অজুহাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এর নেপথ্যে ব্রিটিশ রাজের সুচতুর বিভাজন নীতি কার্যকর ছিল যা পরবর্তীকালে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

পটভূমি

অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং বিপুল জনসংখ্যার কারণে ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে এর সুষ্ঠু প্রশাসন পরিচালনা করা ছিল এক দুরুহ কাজ। তৎকালীন সময়ে বঙ্গের মোট আয়তন ছিল প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮৫ লাখের মতো। যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে কলকাতা কেন্দ্রিক প্রশাসন থেকে বঙ্গের পূর্বাঞ্চল প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল যার ফলে শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে এই অঞ্চল পিছিয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এই বিশাল এলাকাকে শাসন করার সুবিধার্থে এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা আনয়নের উদ্দেশ্যে বাংলা বিভক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

  • বঙ্গ ভঙ্গের পেছনে প্রধান কারণগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।
  • বিশাল আয়তনের কারণে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করা।
  • পূর্ব ও উত্তর বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনগ্রসরতা দূর করা।
  • ব্রিটিশদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্তিমিত করা।
  • ঢাকার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

এই পরিকল্পনার আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ এবং আসামকে নিয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলা সফর করে জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা করেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর এই বিভাজন কার্যকর করা হয়।

প্রভাব

বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অভাবনীয় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় যা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়। মুসলমান সমাজ মূলত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল কারণ তারা মনে করেছিল ঢাকার রাজধানী হওয়ার ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তাদের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয়তাবাদী নেতারা একে মাতৃভূমিকে দ্বিখণ্ডিত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গভঙ্গ রদ করে পুনরায় দুই বাংলাকে একীভূত করে দেয়। যদিও ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় তবুও এর রাজনৈতিক রেশ রয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করা হয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায় যে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল বাংলার ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ যা বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রশাসনিক প্রয়োজনের কথা বলে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ করলেও এর মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের রেখা অঙ্কিত হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পায়। তবে এই ঘটনার ফলেই পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার প্রসারে এক অভাবনীয় বিপ্লব সাধিত হয়। তাই বঙ্গভঙ্গ কেবল একটি বিভাজনের গল্প নয় বরং এটি ছিল বাংলার মানুষের স্বাধিকার ও রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জনের এক দীর্ঘ সংগ্রামের সূচনা।

ট্যাগস:

রাষ্ট্রবিজ্ঞান

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন