সমাজকর্ম
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আমেরিকার সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম আলোচনা কর
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ৬:২২ পিএম

ভূমিকা
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই আমেরিকা কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে তুলেছে। দেশটির সমাজসেবা কার্যক্রমের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকার তার জনগণের বিভিন্ন চাহিদা পূরণের জন্য নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এবং প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থেকে শুরু করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী পর্যন্ত সবার কল্যাণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আমেরিকাকে সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
মানসিক প্রতিবন্ধীদের সেবা কার্যক্রম
আমেরিকায় মানসিক প্রতিবন্ধীদের প্রাথমিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। তাদের অযত্নে বাড়িতে রাখা হতো কিংবা জেলখানায় পাঠানো হতো। তবে ম্যাসাচুয়েটস ও নিউইয়র্কে মানসিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয়। বোস্টনে মানসিক প্রতিবন্ধী যুবকদের জন্য সরকারি স্কুল খোলা হয়, যেখানে খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করা হতো।
১৮৭৫ সালে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের স্কুল স্থাপিত হয়। এক্ষেত্রে ড. স্যামুয়েল গ্রিডলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পেনসিলভিনিয়ায় মানসিক অনগ্রসরদের জন্য বিশেষ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭০ সালে প্রণীত The Development Disabilities Service Act ছিল মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। এই আইনের মাধ্যমে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের যৌথ উদ্যোগে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত সবার চিকিৎসা, শিক্ষা ও মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
অন্ধদের কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপ
আমেরিকায় অন্ধদের ভরণপোষণের জন্য সরকার ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। প্যারিসের অন্ধ স্কুলের আদর্শে ম্যাসাচুয়েটসে প্রথম অন্ধ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে Perkins Institute and Massachusetts School for the Blind নামে পরিচিতি পায়। ১৮৩২ সালে নিউইয়র্কে অন্ধদের জন্য আরেকটি স্কুল স্থাপিত হয়, যার নাম ছিল The New York Institute for the Blind। ১৮৬৩ সালে এই স্কুলে French Braille পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, যা অন্ধদের শিক্ষায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
অন্ধত্ব প্রতিরোধে ড. পার্ক প্রথম গুরুত্ব দেন এবং তার উদ্যোগে National Society for the Prevention of Blindness প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থা থেকে শিশুদের জন্মপূর্ব ও পরবর্তী অন্ধত্ব প্রতিরোধে বিশেষ শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। হাসপাতালগুলোতে চক্ষু প্রতিরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয় এবং ১৯৩৫ সালের সামাজিক নিরাপত্তা আইনে অন্ধদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনে ব্যাপক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মনোবিকারগ্রস্তদের সেবা ব্যবস্থা
প্রাথমিক পর্যায়ে আমেরিকায় মনোবিকারগ্রস্তদের সাথে নির্মম আচরণ করা হতো। ১৭৩২ সালে ফিলাডেলফিয়ার দরিদ্রাগারের হাসপাতালে এবং ১৭৫৩ সালে পেনসিলভিনিয়ায় প্রথম মনোবিকারগ্রস্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ভার্জিনিয়ায় Eastern State Hospital নামে মনোবিকারগ্রস্তদের জন্য প্রথম বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
ড. বেনজামিন রাশ এবং মিস ডরোথিয়া ডিক্স মনোবিকারগ্রস্তদের সেবায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। ১৮৪১ সালে ডরোথিয়া ডিক্স জেলখানা পরিদর্শন করে মহিলা কয়েদিদের করুণ অবস্থা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন। তিনি দরিদ্রাগার ও শ্রমাগার পরিদর্শন করে মনোবিকারগ্রস্তদের প্রতি অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তার প্রচেষ্টায় মনোবিকারগ্রস্তদের কল্যাণের জন্য আইনসভায় বিল পাস হয় এবং মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫৪ সালে কংগ্রেস মানসিক বিকারগ্রস্তদের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন করে জমি অনুদান প্রদান করে।
মূক ও বধিরদের কল্যাণ কার্যক্রম
আমেরিকায় মূক ও বধিররা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল এবং তাদের নির্বোধ বলে গণ্য করা হতো। নিউইয়র্ক শহরে প্রথম মূক ও বধিরদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৮১৭ সালে হার্টফোর্ডে মূকদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। ১৮২৩ সালে কেন্টাকির ড্যানভিলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বোবাদের জন্য প্রথম আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ধরনের স্কুল পরবর্তীতে অন্যান্য শহরেও প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৯ সালে মূক ও বধিরদের জন্য সর্বপ্রথম দিবা স্কুলের ব্যবস্থা করা হয়।
মূক ও বধির সমস্যার প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য American Society for the Hard of Hearing নামক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। এই সংস্থা থেকে মূক ও বধিরদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো এবং প্রয়োজনীয় শ্রবণযন্ত্র সরবরাহ করা হতো। এসব উদ্যোগের ফলে মূক ও বধিররা সমাজের মূলধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
রাজ্য দরিদ্র সেবা ব্যবস্থা
আমেরিকায় প্যারিশ বা কাউন্টি পর্যায়ে স্থানীয় জনগণের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। তবে নবাগত কিংবা বহিষ্কৃত দরিদ্রদের ভরণপোষণের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা ছিল না। এই শর্তের কারণে ম্যাসাচুয়েটসে ত্রাণ কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ১৬৭৫ সালে ম্যাসাচুয়েটসের দরিদ্রদের রাজ্য দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে সাহায্য প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে আমেরিকার অন্যান্য কলোনিতেও এই ব্যবস্থা চালু হয়। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়।
উপসংহার
আমেরিকার সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের বিস্তৃতি আজ অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত এসব কার্যক্রম ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে বর্তমান সমৃদ্ধ অবস্থানে পৌঁছেছে। মানসিক প্রতিবন্ধী, অন্ধ, মনোবিকারগ্রস্ত, মূক ও বধির এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ আমেরিকাকে প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে সামগ্রিক মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা কতটা জরুরি।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন