ইসলামের ইতিহাস
মুঘল সংস্কৃতির উৎকর্ষের ক্ষেত্রে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অবদান মূল্যায়ন কর
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ৮:০৬ এএম

ভূমিকা
মুঘল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি অনন্য অধ্যায় হলো মুঘল চিত্রকলা। বিশেষ করে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে এই শিল্পকলার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যা শিল্পের এক স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত। ১৬০৫ থেকে ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর রাজত্বকালে মুঘল সংস্কৃতি কেবল পরিপক্বতাই লাভ করেনি, বরং এক অতুলনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছিল। পিতা আকবরের প্রতিষ্ঠিত চিত্রশালাকে তিনি নিজস্ব শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এমনভাবে রূপান্তরিত করেন যে ইন্দো-পারস্য মিশ্র ধারা থেকে উদ্ভূত হয় এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মুঘল শিল্পরীতি।
মুঘল চিত্রকলার ইতিহাস
ভারতবর্ষের চিত্রকলার ইতিহাস বহুমাত্রিক এবং মুঘল চিত্রকলার দীপ্তিতে গৌরবোজ্জ্বল। মুঘল চিত্রকলার তিনটি মূল পর্ব রয়েছে। যথা: প্রাথমিক যুগ, স্বর্ণযুগ এবং অধঃপতনের যুগ। প্রাথমিক যুগ শুরু হয় সম্রাট হুমায়ূনের সময় থেকে, কিন্তু প্রকৃত উন্নতি হয় সম্রাট আকবরের অধীনে। আকবরের নীতিতে পারস্য ও ভারতীয় চিত্রকলার মিশ্রণ তৈরি হয়, যেখান থেকে মুঘল শিল্পের মূলে ইন্দো-পারস্য চিত্রকলার প্রভাব পড়ে।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের শিল্পসাহায্য
সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৬০৫-১৬২৭) রাজত্বকালে মুঘল চিত্রকলার স্বর্ণযুগ শুরু হয়। তিনি একজন শিল্পমনা অধিপতি ছিলেন, যিনি পারস্য ও ভারতীয় উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে চিত্রকলার একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র প্রবণতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজত্বে শিল্পীরা বরণীয় সুযোগ পেয়ে মুগ্ধকর মিনিয়েচার, প্রতিকৃতি ও প্রকৃতি-চিত্র অঙ্কন করেছেন।
জাহাঙ্গীরের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পচর্চা
জাহাঙ্গীর নিজেও একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন এবং শিল্পীদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁর রাজত্বকালে মুঘল চিত্রশালায় প্রধানত তিন ধরনের চিত্র অঙ্কিত হত। যেমন পাণ্ডুলিপি চিত্রাবলী বা মিনিয়েচার, প্রতিকৃতি, এবং ফুল-লতাপাতা ও প্রকৃতি। শিল্পীদের কাছ থেকে উদ্ভাবনী কাজ ও সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের মাধ্যমে মুঘল চিত্রকলায় নিখুঁত রূপকল্পের বিকাশ ঘটে।
সম্রাট জাহাঙ্গীর ও প্রধান শিল্পী
জাহাঙ্গীরের শিল্পগোষ্ঠীতে আবুল হাসান ও ওস্তাদ মনসুর ছিলেন দুই প্রধান চিত্রশিল্পী। আবুল হাসানকে যুগের শ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং তাঁর প্রতিকৃতি শিল্প মুঘল চিত্রকলার এক অনবদ্য সৃষ্টি। ওস্তাদ মনসুর প্রাণীজগতের চিত্রায়নে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন, বিশেষত ময়ূর ও তুর্কী মোরগের চিত্রায়নে। এই শিল্পীরা সম্রাটের ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন মাত্রা পাইছে।
মুঘল চিত্রকলার উন্নয়নে জাহাঙ্গীরের গুরুত্ব
জাহাঙ্গীরের পূর্বসূরীদের তুলনায় শিল্পচর্চার দিক থেকে দূরদর্শিতা অনেক বেশি ছিল। তাঁর শাসনকালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে শিল্পীরা অবিরাম কাজ করতে পেরেছেন। জাহাঙ্গীরের শিল্পানুরাগ ও ব্যক্তিগত শৈল্পিক বোধ মুঘল চিত্রকলাকে এক স্বতন্ত্র জাতীয় শিল্পকলায় পরিণত করে। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মুঘল চিত্রকলার বিকাশ এবং উৎকর্ষ ঘটে যা পরবর্তীতে মুঘল সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচুর্য তৈরি করে।
উপসংহার
মুঘল সংস্কৃতির উৎকর্ষে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অবদান পরিস্ফুট ও চিরস্মরণীয়। তাঁর রাজত্বকালে মুঘল চিত্রকলায় নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি ঘটে যা পূর্বের কোনো সম্রাটের সময় হয়নি। শিল্পমনা জাহাঙ্গীরের দৃষ্টিভঙ্গি, একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে মুঘল চিত্রকলাকে স্বর্ণযুগের উচ্চতায় পৌঁছানো হয়।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন