KOFIPOST

KOFIPOST

সমাজকর্ম

ব্যক্তি সমাজকর্ম কী? ব্যক্তি সমাজকর্মে গ্রহণনীতি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতির গুরুত্ব বুঝিয়ে বল ।

জাহিদ হাসান
অ+
অ-
ব্যক্তি সমাজকর্ম কী? ব্যক্তি সমাজকর্মে গ্রহণনীতি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতির গুরুত্ব বুঝিয়ে বল ।
ছবি: গুগল ইমাজিন

ভূমিকা

সমাজকর্ম অনুশীলনের একটি ঐতিহ্যগত ও মৌলিক পদ্ধতি হলো ব্যক্তি সমাজকর্ম। এটি এমন একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, যেখানে পেশাদার সমাজকর্মীগণ সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে এককভাবে সাহায্য করার জন্য বিশেষ পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এর মূল লক্ষ্য হলো সেবাগ্রহীতার সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর সামাজিক ভূমিকা পালনের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার, উন্নয়ন এবং সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। একটি মানবীয় ও কার্যকর সমাধান দিতে গেলে ব্যক্তি সমাজকর্মে দুটি নীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়: গ্রহণনীতি (Acceptance) ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতি (Individualization)। এই নীতিগুলোই সমাজকর্মী ও সাহায্যার্থীর মধ্যে সফল সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করে।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

ব্যক্তি সমাজকর্ম কী?

ব্যক্তি সমাজকর্ম (Casework) হলো সমাজকর্মের এমন একটি পদ্ধতি, যা ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রেখে তাঁর সমস্যা সমাধানে মনোনিবেশ করে। এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁর পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে তাঁকে স্বাবলম্বী করে তোলা। মেরি রিচমন্ডের মতো পথিকৃৎদের হাত ধরে এই পদ্ধতির বিকাশ ঘটে, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তির সমস্যা ও চাহিদা যে আলাদা, সেই ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সাহায্য করে তাঁর ব্যক্তিগত সক্ষমতাকে পুনরুদ্ধার করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

গ্রহণনীতির গুরুত্ব

ব্যক্তি সমাজকর্মের প্রথম ও প্রধান নীতিগুলোর মধ্যে একটি হলো গ্রহণনীতি। এর মূল কথা হলো, সমাজকর্মী তাঁর নিকট আগত সাহায্যার্থীকে উষ্ণ আন্তরিকতা ও মর্যাদা সহকারে গ্রহণ করবেন, বিচার না করে। যদি সমাজকর্মী আন্তরিকভাবে সাহায্যার্থীকে গ্রহণ না করেন, তবে ব্যক্তি সমাজকর্মের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এই নীতির মাধ্যমে একটি পেশাগত সম্পর্ক স্থাপনের ভিত্তি তৈরি হয়।

গ্রহণনীতি যেসব কারণে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে, তা নিম্নরূপ:

  • মানসিক শক্তি সঞ্চার ও ভয়ভীতি দূরীকরণ: সমাজকর্মীর সাথে প্রথম সাক্ষাতে সাহায্যার্থী প্রায়শই হতাশাগ্রস্ত, দুর্বল ও অস্থির থাকেন। পেশাদার সমাজকর্মী যখন সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে তাঁকে সহজভাবে গ্রহণ করেন, তখন সাহায্যার্থীর প্রাথমিক মানসিক চাপ, ভয়ভীতি ও অস্থিরতা অনেকটাই কমে যায়। এতে তাঁর মানসিক শক্তি সঞ্চারের পথ প্রশস্ত হয়।
  • পেশাগত সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন: গ্রহণ একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। সমাজকর্মী যেমন সেবা প্রদানের লক্ষ্য হিসেবে সাহায্যার্থীকে গ্রহণ করেন, তেমনি সাহায্যার্থীও সমাজকর্মীকে তাঁর সমস্যা সমাধানের উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। সমাজকর্মী তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগ করে সাহায্যার্থীর অনুভূতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, যা তাঁদের মধ্যে একটি দৃঢ় পেশাগত সম্পর্কের (Rapport) ভিত্তি তৈরি করে।
  • দূরত্ব হ্রাস ও জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ: সমাজকর্মী ও সাহায্যার্থীর মর্যাদা, চিন্তাভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, তা দূর করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো গ্রহণনীতি। এর মাধ্যমে সমাজকর্মী সাহায্যার্থীর আরও কাছাকাছি আসতে পারেন এবং তাঁর বিশ্বাস অর্জন করেন। এই বিশ্বাসের ফলস্বরূপ সমাজকর্মী তাঁর পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও কৌশলগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ লাভ করেন।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতির প্রয়োজনীয়তা

ব্যক্তি সমাজকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতি। এই নীতির অর্থ হলো, প্রতিটি ব্যক্তি ভিন্ন এবং তাঁর সমস্যা, ব্যক্তিত্ব, পরিস্থিতি, প্রয়োজন ও অনুভূতিও ভিন্ন। তাই একজন সমাজকর্মী কখনোই দু’জন সাহায্যার্থীকে একই দৃষ্টিতে দেখবেন না বা একই সমাধানসূত্র প্রয়োগ করবেন না; বরং প্রতিটি ব্যক্তিকে তাঁর নিজস্বতা ও বিশেষত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়ন ও সাহায্য করবেন।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতির চর্চা ব্যক্তি সমাজকর্মে যেসব কারণে অপরিহার্য:

  • ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদা সংরক্ষণ: প্রতিটি ব্যক্তিরই ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। এই নীতি চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা সুরক্ষিত থাকে। সমাজকর্ম ব্যক্তির এই স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং তার প্রতি সম্মান জানায়। এফ. পি. বিসটেকের মতে, "Individualization is based upon the right of human beings to be individuals and to be treated not just as human beings but this human with personal differences."
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও আত্মপ্রত্যয়: এই নীতি ব্যক্তিকে নিজের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। যেহেতু সমস্যাটি ব্যক্তির নিজস্ব, তাই এর সমাধানে তাঁর মতামতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় সাহায্যার্থীর আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় জাগ্রত হয়, যা তাঁকে সমস্যার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।
  • সমস্যার সহজ ও কার্যকর সমাধান: যখন সমাজকর্মী প্রতিটি সমস্যাকে অনন্য (Unique) হিসেবে দেখেন এবং সাহায্যার্থীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান রূপরেখা প্রণয়নে সহায়তা করেন, তখন সমস্যার সহজ ও কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। এটি শুধুমাত্র একটি রুটিনমাফিক সাহায্য নয়, বরং ব্যক্তির ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের একটি পথ।

উপসংহার

ব্যক্তি সমাজকর্মের সাফল্যের জন্য গ্রহণনীতি এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গ্রহণনীতি যেখানে সাহায্যার্থীর ভয়ভীতি দূর করে সমাজকর্মীর সাথে একটি উষ্ণ ও পেশাগত সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে, সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যীকরণ নীতি প্রতিটি ব্যক্তির মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই দুটি নীতি একত্রে কাজ করে বলে একজন সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি কেবল সাময়িক সাহায্যই পান না, বরং নিজের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যান। এই মানবীয় ও গভীর প্রক্রিয়াটিই ব্যক্তি সমাজকর্মকে সমাজসেবার জগতে একটি অনন্য ও অপরিহার্য স্থান দিয়েছে।

ট্যাগস:

ডিগ্রিপড়াশোনাঅনার্স

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন