KOFIPOST

KOFIPOST

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস

সাম্প্রদায়িকতা কি? সাম্প্রদায়িকতা বলতে কি বুঝ

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
সাম্প্রদায়িকতা কি? সাম্প্রদায়িকতা বলতে কি বুঝ
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটি আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। এই ধারণাটি কেবল ধর্মীয় বিভাজন নয়, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বহু বছরের পরিকল্পিত বিভাজনের ইতিহাস। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ হিসেবে আমি মনে করি, সাম্প্রদায়িকতার সঠিক স্বরূপ এবং এর নেপথ্যের কারণগুলি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

সাম্প্রদায়িকতা কী?

সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িকতা বলতে বোঝায়, ধর্মের নামে ধর্মীয় লক্ষ্যের অতিরিক্ত কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করা। এটি একটি নেতিবাচক এবং সংকীর্ণ মনোভাব, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থকে অন্য সকল গোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও শ্রেষ্ঠ মনে করে।

সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষেরা মনে করেন যে, তাদের ধর্মীয় অনুগামীদের সকল স্বার্থ অভিন্ন এবং তা অন্য সম্প্রদায় থেকে পৃথক। তারা ধর্মীয় বিশ্বাসকেই সমাজ ও রাজনীতির ভিত্তি বলে গণ্য করেন। যখন কোনো সম্প্রদায় তাদের ধর্মকে ধর্মান্ধতায় রূপান্তর করে, এবং নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য এই ধর্মীয় পরিচয়কে হাতিয়ার করে, তখনই জন্ম নেয় মারাত্মক সাম্প্রদায়িকতা। এই মনোভাব ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দেশের জনগণের ঐক্য স্থাপনকে সমর্থন করে না, বরং বিভেদ সৃষ্টি করে।

ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম ও বিকাশ

ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। বহুকাল ধরে বাংলার হিন্দু ও মুসলমানরা সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু ভারতে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হওয়ার পর এই চিত্র পাল্টে যেতে থাকে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী সুকৌশলে 'বিভাজন ও শাসন' (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, হিন্দু ও মুসলমানের সম্মিলিত জাতীয় ঐক্য তাদের শাসনের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই তারা পরিকল্পিতভাবে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে বৈষম্য সৃষ্টি করতে থাকে।

এই বৈষম্যের ফলস্বরূপ হিন্দু ও মুসলমানরা ক্রমান্বয়ে একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। তারা একে অন্যকে পরিপূরক না ভেবে শত্রু ভাবতে শুরু করে। এর পরিণতিতে জন্ম নেয় 'সাম্প্রদায়িক জাতীয়তা'। মুসলমানরা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে ইসলামিক জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করে। ঠিক তেমনি হিন্দুরাও তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনকে কেন্দ্র করে হিন্দু জাতীয়তাবোধ গঠন করে। এই দুটি ধারা একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ায়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সমস্যা মূলত ব্রিটিশদের দ্বারা সৃষ্ট একটি সুচিন্তিত সমস্যা। ঔপনিবেশিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য তারা হিন্দু ও মুসলমানদের একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে একসাথে বসবাসকারী এই দুই সম্প্রদায় ফলস্বরূপ একে অপরের শত্রু ভাবতে শুরু করে। পরবর্তীকালে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে এই সাম্প্রদায়িকতা তীব্র আকার ধারণ করে। এই বিভাজনের বিষক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত অখণ্ড ভারত বর্ষকে খণ্ডিত করে ফেলে। এই সাম্প্রদায়িক চেতনা আজও আমাদের সমাজে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এই বিভাজনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব।

ট্যাগস:

ডিগ্রিডিগ্রি সাজেশনসাম্প্রদায়িকতাভারত বিভাগসামাজিক ঐক্য

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন