KOFIPOST

KOFIPOST

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস

অপারেশন সার্চলাইট বলতে কি বুঝ ।

মোঃ আব্দুল  আলিম
অ+
অ-
অপারেশন সার্চলাইট বলতে কি বুঝ ।

ভূমিকাঃ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা করে। এই রাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। নিরস্ত্র মানুষের উপর এই নৃশংস আক্রমণ কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল সুপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অভিযানের ভয়াবহতা বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামকে আরও তীব্র ও দৃঢ় করে তোলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যঃ

অপারেশন সার্চলাইট ছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একটি সুপরিকল্পিত ও গোপন অভিযান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। বাঙালিদের ন্যায্য দাবি ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করার লক্ষ্যে তারা এই নারকীয় পরিকল্পনা করে। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ছাত্র ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের গ্রেপ্তার বা হত্যা করে বাঙালি জাতির নেতৃত্বশূন্য করা। পাকিস্তানি শাসকরা মনে করেছিল, নেতৃত্ব ধ্বংস করলে স্বাধীনতা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে এবং তারা পূর্ব পাকিস্তানের উপর পুনরায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

এই অভিযানের প্রস্তুতি চলছিল অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। পাকিস্তান সরকার আলোচনার নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে বিভ্রান্ত করে রেখেছিল, অন্যদিকে সামরিক বাহিনী চূড়ান্ত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন এবং মধ্যরাতের পরই শুরু হয় ইতিহাসের এক ভয়ংকরতম গণহত্যা।

অভিযানের ভয়াবহতা ও ব্যাপকতাঃ

২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকেই ঢাকা শহর পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক, মেশিনগান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও রোকেয়া হলে শত শত ছাত্রছাত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা পুলিশ সদস্যদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তরে বাঙালি সেনাদের হত্যা করা হয় এবং পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে চালানো হয় পরিকল্পিত গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগ।

ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই হত্যাযজ্ঞ দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, কুমিল্লা, যশোর সহ প্রতিটি শহরে একই ধরনের নির্মমতা চালানো হয়। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, নারীদের উপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র তারা বাঙালি বলে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই বর্বরতার কোনো সীমা ছিল না। তারা শিশু, নারী, বৃদ্ধ কাউকেই রেহাই দেয়নি। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে নয় মাসব্যাপী যে গণহত্যা শুরু হয়েছিল, তাতে আনুমানিক ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় এবং প্রায় এক করোড় মানুষ ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়।

উপসংহারঃ

অপারেশন সার্চলাইট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হলেও এটি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করে। পাকিস্তানি শাসকদের এই নৃশংসতা বাঙালিদের মনোবল ভাঙতে পারেনি, বরং তাদের প্রতিরোধের শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয়। অপারেশন সার্চলাইটের শিকারদের স্মরণ করা এবং তাদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

ট্যাগস:

ডিগ্রিঅনার্স

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন