KOFIPOST

KOFIPOST

ইসলামের ইতিহাস

শেরশাহের শাসন সংস্কার সম্পর্কে আলোচনা কর

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
শেরশাহের শাসন সংস্কার সম্পর্কে আলোচনা কর

অথবা, শেরশাহের বিভিন্ন সংস্কার মূল্যায়ন কর।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

অথবা, রাজ্য পরিচালনায় শেরশাহ যেসব সংস্কার সাধন করেন তা বর্ণনা কর।

ভূমিকা

শেরশাহ সুরি ভারতীয় ইতিহাসের একজন অসাধারণ প্রশাসক এবং দূরদর্শী শাসক হিসেবে স্বীকৃত। ১৫৪০ সালে মুঘল সম্রাট হুমায়ূনকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করা এই পাঠান নেতা শুধু একজন সামরিক নেতা নয়, বরং একজন প্রকৃত সংস্কারক ছিলেন। তার স্বল্প শাসনকাল সত্ত্বেও শেরশাহ এমন সব সংস্কার সাধন করেছিলেন যা রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এক নতুন মান স্থাপন করে গেছে এবং পরবর্তী মুঘল সম্রাটদের জন্য এক অমূল্য উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছে।

প্রশাসনিক নীতিমালা

শেরশাহের শাসনব্যবস্থার মূলমন্ত্র ছিল জনকল্যাণ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। তিনি যদিও এককেন্দ্রিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করেছিলেন, তবুও তার লক্ষ্য কখনো প্রজা নিপীড়ন ছিল না, বরং তা ছিল সুসংগত এবং ন্যায্য শাসনের প্রতিষ্ঠা। হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা ছিল তার রাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পরবর্তীকালে আকবর যেমন সর্বধর্ম সমন্বয়ের মাধ্যমে সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, শেরশাহও অনুরূপভাবে সকল শ্রেণির জনগণের সদিচ্ছা এবং আস্থার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পুনর্গঠন

শেরশাহ রাজ্যের সুশাসন নিশ্চিত করতে চার জন মন্ত্রী এবং চার জন পদস্থ কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। প্রথম মন্ত্রণালয় ছিল নিউয়ান-ই-গুজারাত, যা অর্থনৈতিক বিষয়াবলি তত্ত্বাবধান করতো এবং এর প্রধান ওয়াজির রাজ্যের সম্পূর্ণ আয়-বাজেট সম্পর্কে দায়বদ্ধ ছিলেন। দ্বিতীয় মন্ত্রণালয় নিউয়ান-ই-আরজ ছিল সামরিক বিভাগ, যেখানে আরিফ-ই-মামালিক নামে পরিচিত প্রধান সেনাবাহিনী গঠন, সৈন্য সংগ্রহ, তাদের বেতন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। তৃতীয় বিভাগ নিউয়ান-ই-রিসালাত বৈদেশিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক বিষয়াবলি পরিচালনা করতো, এবং চতুর্থ বিভাগ নিউয়ান-ই-ইনশা যোগাযোগ এবং সরকারি নথিপত্র ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পাদন করতো।

প্রাদেশিক প্রশাসনব্যবস্থা

কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য শেরশাহ সমগ্র সাম্রাজ্যকে সাতচল্লিশটি সরকারে বিভক্ত করেছিলেন, এবং প্রতিটি সরকারকে আরো ছোট ছোট পরগনায় ভাগ করেছিলেন। প্রতিটি প্রাদেশিক স্তরে শিকদার-ই-শিকদারান এবং মুন্সেফ-ই-মুনসিকার নামে দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল, যারা যথাক্রমে সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনের তদারকি করতেন। এই বিন্যাস কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একটি শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টি করেছিল।

রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কার

শেরশাহ রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য একটি বৈপ্লবিক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম সমগ্র দেশে ব্যবস্থিত ভূমি জরিপ পরিচালনা করেছিলেন এবং উৎপাদিকা ক্ষমতার ভিত্তিতে চাষীদের নিকট থেকে ফসলের এক-তৃতীয়াংশ অথবা এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব নির্ধারণ করেছিলেন। রাজস্ব আদায়ের জন্য তিনি মুকাদ্দাস, চৌধুরী এবং পাটোয়ারি সহ বিশেষায়িত কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। আয়-ব্যয়ের এই নতুন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কেবল রাজস্ব বৃদ্ধি নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করেছিল।

কৃষক নীতি এবং ভূমি মালিকানা

শেরশাহ কবুলিয়ত এবং পাট্টা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে জমিদারি প্রথার অব্যবহারিকতা দূর করেছিলেন। কবুলিয়ত হলো কৃষকদের দ্বারা সরকারের কাছে দেওয়া একটি অঙ্গীকার যেখানে তারা জমির উপর তাদের দায়িত্ব এবং অধিকার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতো, আর পাট্টা ছিল সরকার থেকে প্রাপ্ত একটি সরকারি নথি যা কৃষকদের জমির উপর নিরাপদ মালিকানা স্বীকার করতো। এই ব্যবস্থা কৃষকদের অধিকার সুরক্ষিত করার পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাকেও আরো স্বচ্ছ এবং ন্যায্য করে তুলেছিল।

মুদ্রা এবং বাণিজ্য নীতি

শেরশাহ একটি যুগোত্তীর্ণ মুদ্রা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি একশ পঁয়ষট্টি, একশ ছিষট্টি এবং একশ সাতষট্টি ওজনের স্বর্ণমুদ্রা এবং বিভিন্ন মূল্যের রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা চালু করেছিলেন। আধুলি, সিকি এবং দুই আনার মতো খুচরা মুদ্রার প্রবর্তন দৈনন্দিন লেনদেনকে সহজ করেছিল। ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড মন্তব্য করেছেন যে এই মুদ্রা সংস্কার ভারতীয় মুদ্রাব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মূল্যবান অবদান ছিল। অভ্যন্তরীণ শুল্ক অফিস বিলোপ করে শেরশাহ বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করেছিলেন, যদিও বৈদেশিক পণ্যের উপর সীমান্ত এবং বিক্রয় কেন্দ্র উভয় স্থানে আড়াই শতাংশ হারে শুল্ক আদায় করা হয়েছিল।

সামরিক সংস্কার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা

শেরশাহ জায়গিরদারি প্রথা বিলুপ্ত করে বেতনভোগী পেশাদার সৈন্য নিয়োগের একটি নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। দাগ এবং চেরা নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় প্রতিটি সৈন্যের ঘোড়ায় একটি দাগ এবং সৈন্যের নিজস্ব একটি বিশেষ চিহ্ন রাখা হতো, যা দুর্নীতি এবং অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর ছিল। এর পাশাপাশি শেরশাহ একটি শক্তিশালী পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন যা গ্রামীণ এবং শহুরে দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। তিনি একটি ব্যাপক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে অবিলম্বে কেন্দ্রীয় সরকারকে অবহিত করতো। ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ মন্তব্য করেছেন যে শেরশাহের পুলিশি ব্যবস্থা সুলতানি যুগের জন্য অত্যন্ত উন্নত এবং শক্তিশালী ছিল।

পরিবহন এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক

শেরশাহ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি বিস্তৃত এবং সুপরিকল্পিত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করেছিলেন। সৈন্যদের দ্রুত সরবরাহ, জনগণের যাতায়াত এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে তিনি অসংখ্য রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। বিখ্যাত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড যা আজও এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজপথগুলির একটি, শেরশাহের এই যুগান্তকারী উদ্যোগের স্মৃতিচিহ্ন। যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তিনি ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে সরাইখানাগুলি ডাকচৌকি হিসেবে কাজ করতো এবং ঘোড়ার ডাকের মাধ্যমে দ্রুত সংবাদ বহন করা হয়েছিল।

বিচার ব্যবস্থার উদ্ভাবন

শেরশাহ ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অসাধারণ মান স্থাপন করেছিলেন যা তার সময়কালে সর্বজনস্বীকৃত ছিল। দার-উল-আদালত নামক একটি কেন্দ্রীয় আদালতে কাজি এবং মির-ই-আদালত বিচার কার্য সম্পাদন করতেন, এবং শেরশাহ স্বয় প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় আবেদন শুনতেন। হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জন্য একই ফৌজদারি আইন থাকলেও বেসামরিক বিষয়ে তাদের নিজস্ব আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে। গ্রামীণ এলাকায় পঞ্চায়েত এবং স্থানীয় মোড়লরা স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। ঐতিহাসিক মোহার আলী মন্তব্য করেছেন যে শেরশাহ ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ভয়ংকর সিংহের মতো দৃঢ় এবং নিরপেক্ষ ছিলেন।

সামাজিক কল্যাণ এবং শিক্ষা

শেরশাহ শুধুমাত্র একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, বরং একজন শিক্ষাবিদ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা বা জোতদারদের অত্যাচারে ফসলের ক্ষতি হলে তিনি রাজস্ব মওকুফ এবং কৃষি ঋণের সুবিধা প্রদান করতেন। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং আরবি, ফারসি এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছিলেন। তার রাজকীয় গৃহস্থালি পরিচালনার জন্য খান-ই-সামান নামক একটি বিশাল বিভাগ রয়েছে যেখানে অসংখ্য কর্মচারী এবং সেবক নিয়োগ করা হয়েছিল।

উপসংহার

শেরশাহ সুরি ভারতীয় ইতিহাসে একজন অবিস্মরণীয় শাসক হিসেবে চিরস্মরণীয় থেকে যাবেন যিনি মাত্র পনেরো বছরের শাসনকালে এমন সব সংস্কার সাধন করেছিলেন যা পরবর্তী যুগের রাজনেতাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। তার প্রশাসনিক উদ্ভাবন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণমুখী নীতিমালা তাকে আকবরের মতো মহান সম্রাটদের সমতুল্য করে তুলেছে। যদিও তার শাসনব্যবস্থা এককেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু এটি ছিল দক্ষ, প্রগতিশীল এবং প্রজাদের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। ঐতিহাসিক কানে যথাযথভাবে মন্তব্য করেছেন যে কোনো শাসক, এমনকি ব্রিটিশ সরকারও এই পাঠান নেতার মতো শাসনকার্যে এত দক্ষতা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারেনি।

ট্যাগস:

ডিগ্রিপড়াশোনাইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন