KOFIPOST

KOFIPOST

ইসলামের ইতিহাস

সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি আলোচনা কর

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি আলোচনা কর
ছবি: সংগৃহীত

ভূমিকা

মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সম্রাট আকবর একজন দূরদর্শী ও কুশলী শাসক হিসেবে স্বীকৃত। তার ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ রাজত্বকালে তিনি যেসব নীতি ও কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, তার মধ্যে রাজপুত নীতি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। ভারতবর্ষের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অপরিহার্য ছিল। বিশেষত রাজপুত জাতি, যারা ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা এবং ভারতীয় রাজনীতির শক্তিশালী অংশীদার, তাদের আস্থা অর্জন ছিল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যাবশ্যক। আকবর বুঝতে পেরেছিলেন যে শত্রুতার পথে না গিয়ে সহযোগিতার মাধ্যমেই মুঘল সাম্রাজ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

রাজপুত নীতির পরিচয়

রাজপুত নীতি বলতে মূলত সম্রাট আকবরের সেই কৌশলগত পদক্ষেপগুলোকে বোঝায়, যার মাধ্যমে তিনি হিন্দু রাজপুত সম্প্রদায়ের সাথে মিলনাত্মক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। ভারতে মুঘল আধিপত্য সুদৃঢ় করতে আকবর রাজপুতদের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং তাদের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করেন। এই নীতির আওতায় তিনি রাজপুতদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন এবং তাদেরকে সাম্রাজ্য পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এটি ছিল একটি দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল, যা পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে মজবুত করেছিল।

রাজপুত নীতি গ্রহণের কারণ

আকবরের রাজপুত নীতি গ্রহণের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ক্রিয়াশীল ছিল। প্রথমত, ভারতে মুঘল শাসন শুরুর পর থেকেই রাজপুত রাজারা মুসলিম শাসকদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়। আকবর বুঝতে পেরেছিলেন যে তার পূর্বসূরিদের মতো শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখলে সামরিক শক্তি ক্ষয় হবে এবং সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবে।

দ্বিতীয়ত, আকবর তার শাসনকালে অভ্যন্তরীণ নানা বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছিলেন। শাহ মনসুর, মির্জা মুহম্মদ হাকিম, এমনকি তার অভিভাবক বৈরাম খান এবং পুত্র সেলিমও বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে বাহ্যিক শত্রু রাজপুতদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সাম্রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারত। তৃতীয়ত, রাজপুতরা ছিল অত্যন্ত দক্ষ ও রণনিপুণ যোদ্ধা, যাদের সামরিক শক্তি সাম্রাজ্য বিস্তারে কাজে লাগানো যেত। এছাড়া আকবরের মা এবং তার বাল্যকালের শিক্ষক আব্দুল লতিফ তার মনে উদারনীতির বীজ বপন করেছিলেন, যা রাজপুত নীতি গ্রহণে তাকে উৎসাহিত করেছিল।

রাজপুত নীতির মূল বৈশিষ্ট্য

সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন। তিনি রাজপুত রাজপরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে সম্পর্কের ভিত্তিকে শক্তিশালী করেন। ১৫৬২ সালে জয়পুরের রাজা বিহারীমলের কন্যা যোধাবাঈকে বিবাহ করা ছিল এই নীতির প্রথম পদক্ষেপ। পরবর্তীতে তিনি বিকানির ও জয়সলমিরের রাজকন্যাদের সাথেও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এমনকি ১৫৮৪ সালে তিনি তার পুত্র সেলিমের সাথে অমরের রাজা ভাগবানদাসের কন্যা মনাবাঈয়ের বিবাহ দেন।

শুধু বৈবাহিক সম্পর্কেই আকবর সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি রাজপুতদের সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন উচ্চপদে নিয়োগ দিয়ে তাদের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। রাজা বিহারীমল, টোডরমল, রাজা বীরবল, ভগবান দাস এবং মানসিংহের মতো প্রতিভাবান রাজপুতরা আকবরের দরবারে নীতিনির্ধারক ও পরামর্শদাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া তিনি হিন্দুদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেন এবং কখনো বিজিত রাজপুতদের উপর অত্যাচার করেননি।

ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার

আকবরের রাজপুত নীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক সংস্কার। ১৫৬৩ সালে তিনি হিন্দুদের তীর্থকর রহিত করেন এবং ১৫৬৪ সালে জিজিয়া কর মওকুফ করেন, যা রাজপুত সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি স্বয়ং হিন্দুদের হোলি, রাখী, দীপালি প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আকবর সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে পশু জবাই নিষিদ্ধ করেন এবং গরু জবাই সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এছাড়া তিনি রাজপ্রাসাদে হিন্দু সম্রাজ্ঞীদের উপাসনার জন্য মন্দির নির্মাণ করেন। হিন্দু সমাজের নানা কুসংস্কার দূর করতেও তিনি সচেষ্ট ছিলেন। বাল্যবিবাহ প্রথা সংশোধন এবং বর্ণবৈষম্য দূরীকরণের জন্য তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। হিন্দু কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ ও চিত্রশিল্পীদের তিনি উদারভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, যা হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

রাজপুত নীতির ফলাফল ও সাফল্য

আকবরের রাজপুত নীতির ফলাফল ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী। এই নীতির মাধ্যমে তিনি রাজপুতদের আস্থা ও সহযোগিতা অর্জন করতে সক্ষম হন। মেবারের রানা প্রতাপ সিংহ ছাড়া প্রায় সকল রাজপুত রাজা আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের অংশীদার হয়ে ওঠেন। রাজপুতদের সামরিক দক্ষতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা মুঘল শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

বিজেতা, শাসক ও সংস্কারক হিসেবে আকবরের যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে রাজপুতদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ঐতিহাসিক ভি ডি মহাজনের মতে, সৌহার্দ্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে আকবর রাজপুতদের ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হন এবং এর মাধ্যমে দেশে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেন। এই নীতি পরবর্তী মুঘল শাসকদের জন্যও একটি আদর্শ মডেল হিসেবে কাজ করেছিল।

উপসংহার

সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি মুঘল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। তিনি শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পথ বেছে নিয়ে একটি বহুত্ববাদী সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচনা করেছিলেন। রাজপুতদের প্রতি তার উদার মনোভাব, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সামাজিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ শুধু তার শাসনকালেই নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে আছে। আকবরের এই দূরদর্শী নীতি প্রমাণ করে যে বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে এবং সকলকে সমান সুযোগ দিয়েই একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব।

ট্যাগস:

ডিগ্রিঅনার্সইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিপড়াশোনামুঘল সাম্রাজ্যআকবরের রাজপুত নীতিজিজিয়া কর

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন