যেসব খাবার কিডনির জন্য হতে পারে হুমকি
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৪৫ পিএম

আমরা সবাই জানি যে স্বাস্থ্যকর খাবার আমাদের শরীরের জন্য উপকারী। কিন্তু আশ্চর্যজনক সত্য হলো, এমন অনেক খাবার রয়েছে যেগুলো আমরা প্রতিদিন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো ভেবে খাচ্ছি, অথচ সেগুলোই কিডনির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিডনির স্বাস্থ্য রক্ষায় সাধারণত আমরা লবণ কমানো, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলার কথা চিন্তা করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছু পুষ্টিকর খাবারও কিডনির জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে যদি সেগুলো অতিরিক্ত বা ভারসাম্যহীনভাবে খাওয়া হয়।
মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি রক্ত পরিশোধনের দায়িত্ব পালন করে। এটি রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থ এবং বর্জ্য অপসারণ করে, শরীরে খনিজ পদার্থের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন কিডনিকে অতিরিক্ত প্রোটিন, পটাসিয়াম বা ফসফরাসের মতো খনিজ পদার্থ প্রক্রিয়া করতে হয়, তখন এই অঙ্গটি ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়ে। বিপজ্জনক বিষয় হলো, কিডনির ক্ষতি প্রায়শই নীরবে ঘটে এবং লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই বছরের পর বছর ধরে ধীরগতিতে ক্ষয় চলতে থাকে।
প্রোটিন শরীরের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান হলেও অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ কিডনির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান সময়ে ফিটনেস সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষ বেশি মাত্রায় প্রোটিন গ্রহণ করছেন। প্রোটিন শেক, বার, চর্বিহীন মুরগির মাংস, ডিম, মাছ এবং পনির এখন প্রায় প্রতিটি খাবারের অংশ হয়ে উঠেছে। শরীর যখন প্রোটিন ভাঙে, তখন এর থেকে বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয় যা কিডনিকে অপসারণ করতে হয়। সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত প্রোটিন সমস্যা নয়, কিন্তু যাদের ইতিমধ্যে কিডনিতে সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রোটিন কিডনির ক্ষতি দ্রুততর করতে পারে।
পালং শাক, বিট এবং মিষ্টি আলুর মতো সবজি ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ বলে এগুলোকে সুপারফুড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এসব খাবারে উচ্চ মাত্রায় অক্সালেট রয়েছে, যা কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। অনেকে প্রতিদিন সকালে পালং শাকের স্মুদি পান করেন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য, কিন্তু এই অভ্যাস কিডনিতে পাথর গঠনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। যারা আগে থেকেই কিডনিতে পাথরের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই খাবারগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে খাওয়া উচিত।
ফলমূল স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে পরিচিত, কিন্তু কিছু ফল অতিরিক্ত খেলে কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কলা, কমলা, কিউই, অ্যাভোকাডো এবং কিশমিশ ও এপ্রিকটের মতো শুকনো ফলে পটাসিয়ামের মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় কিডনি শরীরে পটাসিয়ামের ভারসাম্য ঠিক রাখে। কিন্তু যখন কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, তখন রক্তে পটাসিয়াম জমা হতে শুরু করে, যা হৃদযন্ত্রের স্পন্দন এবং ছন্দকে প্রভাবিত করে। এমনকি হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের কারণও হতে পারে। তাই কিডনি রোগীদের এই ফলগুলো খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ডাবের পানি প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে, সতেজতা দেয় এবং ব্যায়ামের পর শক্তি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। কিন্তু ডাবের পানিতেও পটাসিয়ামের পরিমাণ বেশ বেশি থাকে। মাঝেমধ্যে ডাবের পানি পান করা স্বাস্থ্যকর, কিন্তু প্রতিদিন নিয়মিত পান করার ফলে, বিশেষত যাদের ইতিমধ্যে কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তাদের কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তাই ডাবের পানি পরিমিত পরিমাণে পান করা বুদ্ধিমানের কাজ।
দুধ, পনির এবং দইয়ের মতো দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিনের চমৎকার উৎস। কিন্তু এসব খাবারে ফসফরাসের পরিমাণও উচ্চ থাকে। সুস্থ কিডনি ফসফরাস ফিল্টার করে শরীর থেকে বের করে দিতে পারে, কিন্তু যখন কিডনি দুর্বল হয়ে যায়, তখন রক্তে ফসফরাসের মাত্রা বেড়ে যায়। উচ্চ ফসফরাসের মাত্রা হাড়কে দুর্বল করে এবং রক্তনালীতে ক্ষতির সৃষ্টি করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিডনি রোগে আক্রান্তদের দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাদাম এবং বীজ পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হিসেবে পরিচিত। তবে এগুলোতে উচ্চ মাত্রায় ফসফরাস এবং অক্সালেট থাকে। কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা বা কিডনির সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিন বাদাম খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। তবে সূর্যমুখী বীজ, কুমড়োর বীজ এবং আখরোট তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচিত। এসব খাবার পরিমিতভাবে খাওয়াই উত্তম।
আচার, কিমচি এবং অন্যান্য গাঁজানো খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও এগুলোতে লবণের পরিমাণ অত্যধিক থাকে। অতিরিক্ত লবণ কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে এসব খাবার খেলে সমস্যা হয় না, কিন্তু নিয়মিত বা একবারে বেশি পরিমাণে খেলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। বিশেষত যাদের ইতিমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যা আছে, তাদের লবণাক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ভালো, কিন্তু যে কোনো খাবারই অতিরিক্ত খেলে ক্ষতি হতে পারে। কিডনির স্বাস্থ্য রক্ষায় খাবারের ভারসাম্য এবং বৈচিত্র্য বজায় রাখা জরুরি। যাদের পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস আছে বা যারা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাদের খাবার নির্বাচনে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা কিডনির দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন