ইসলামের ইতিহাস
ওবায়দুল আল মাহদী কিভাবে উওর আফ্রিকার ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠাতা করেন?
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ৪ নভেম্বর ২০২৫, ৮:৩৭ এএম

ইসলামের ইতিহাসে উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর মুসলিম বিশ্বে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়, তার প্রভাবে একদল মুসলমান হযরত আলী (রা.) এবং তার বংশধরদের প্রতি গভীর আনুগত্য প্রদর্শন করতে শুরু করেন। এই আনুগত্য ও সহমর্মিতা থেকেই পরবর্তীকালে উত্তর আফ্রিকায় একটি শক্তিশালী শিয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯০৯ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়ায় ওবায়দুল্লাহ আল মাহদীর নেতৃত্বে এই ফাতেমীয় খিলাফতের যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে তার উত্তরসূরী আল মুইজের হাত ধরে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।
ফাতেমীয়দের পরিচয় ও উৎপত্তি
ফাতেমীয় নামটি এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কনিষ্ঠ কন্যা ফাতিমাতুজ জোহরা (রা.) এর নাম থেকে। তিনি ছিলেন হযরত আলী (রা.) এর সহধর্মিনী। ৯০৯ খ্রিস্টাব্দে হযরত আলী (রা.) এর অনুসারী ইসমাঈলী শিয়ারা উত্তর আফ্রিকায় আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একটি স্বতন্ত্র খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। এই খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মাহদী নিজেকে হযরত ফাতিমা (রা.) এর প্রত্যক্ষ বংশধর বলে দাবি করেন। এই দাবির ভিত্তিতেই তার বংশধরগণ এবং এই খিলাফত ফাতেমীয় নামে পরিচিতি লাভ করে।
আবদুল্লাহ ইবনে মায়মুনের সাংগঠনিক ভিত্তি
ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার পেছনে দীর্ঘ এবং সুসংগঠিত প্রস্তুতি ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে মায়মুন এই প্রস্তুতির অন্যতম মূল স্থপতি। তিনি ফাতেমীয় মতবাদগুলোকে সুবিন্যস্ত করে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উত্তর সিরিয়ার সালামিয়া থেকে তিনি ইসমাঈলী শিয়াদের সংগঠিত করেন এবং তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালান। তার মূল লক্ষ্য ছিল আব্বাসীয় খিলাফত উৎখাত করে একটি নতুন খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা।
আবদুল্লাহ ইবনে মায়মুন শুধুমাত্র মতবাদ প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি ফাতেমীয় মতবাদ প্রচারের জন্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে দক্ষ প্রচারক প্রেরণ করেন। তার সংগঠনে সদস্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত এবং সাতটি স্তরে বিভক্ত। কর্মীদের গুণগত মান বিচারে তিনি চরম সূক্ষ্মতা অবলম্বন করতেন। তার এই দূরদর্শী প্রচেষ্টার ফলেই পরবর্তীকালে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটাই সুগম হয়ে ওঠে।
আহমদের নেতৃত্ব ও সম্প্রসারণ
আবদুল্লাহ ইবনে মায়মুনের মৃত্যুর পর ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে তার পুত্র আহমদ শিয়া ইসমাঈলী সংগঠনের প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তার পিতার কাজকে আরও বিস্তৃত করেন। ৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে আহমদ ইবনে হাউশাব নামক একজন দক্ষ প্রচারককে কুফা থেকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেন। ইবনে হাউশাব ইয়েমেনে পৌঁছে সেখানে ফাতেমীয় মতবাদের জোরালো প্রচারণা শুরু করেন।
ইবনে হাউশাব পরবর্তীতে হুলওয়ানী এবং সুফিয়ান নামক দুজন প্রচারককে ইফরিকিয়ায় (বর্তমান উত্তর আফ্রিকা) প্রেরণ করেন। তারা ফিলিস্তিনের উত্তর-পশ্চিমে বসবাসকারী আব্বাসীয় বিরোধী কুতামা গোত্রের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। এই গোত্র পরবর্তীতে ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠায় মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে।
আবু আবদুল্লাহ আশ-শিঈর অবদান
ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো আবু আবদুল্লাহ আশ-শিঈ। ঘানার অধিবাসী এই ব্যক্তি প্রথমে সামানীয় রাজবংশের ওজন বিষয়ক পরিদর্শক হিসেবে কাজ করতেন। এক পর্যায়ে তিনি ইয়েমেনে গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানরত ইবনে হাউশাবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। হাউশাব তার দক্ষতা এবং সাংগঠনিক ক্ষমতায় অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং তাকে ইফরিকিয়ায় প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন।
আশ-শিঈ ইফরিকিয়ায় পৌঁছে গোপনে তীব্র প্রচারণা শুরু করেন। তিনি কুতামা গোত্রের মানুষদের আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলেন। তার প্রচারণার একটি বিশেষ কৌশল ছিল স্থানীয় ভাষা এবং প্রতীকের ব্যবহার। তিনি ইফরিকিয়ার আল খায়াব উপত্যকার জনগণকে বোঝান যে, আল খায়াব শব্দের অর্থ ন্যায়নীতির উপত্যকা এবং কুতামা শব্দের অর্থ কীর্তিমান। তিনি প্রচার করেন যে, অত্যাচারিত এই অঞ্চলে শীঘ্রই ইমাম মাহদী আগমন করবেন এবং একটি স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন।
আগলাবীদের সঙ্গে সংঘাত
আগলাবী বংশ তখন উত্তর আফ্রিকার একটি বড় অংশ শাসন করত। আগলাবী শাসক ইবরাহিম আশ-শিঈর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তার ভাই আবুল আহওয়ালকে আশ-শিঈর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। তবে আশ-শিঈ কৌশলে পিছিয়ে যান এবং সংঘাত এড়িয়ে চলেন। ৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ইবরাহিম আগলাবীর মৃত্যু হলে তার বিলাসপ্রিয় পুত্র জিয়াদাতুল্লাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং তার ভাইকে অভিযান থেকে ফিরিয়ে আনেন।
জিয়াদাতুল্লাহ আশ-শিঈকে দমন করার জন্য খুতবায় তাকে কাফের ঘোষণা করেন এবং ৪০ হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু আশ-শিঈর সুসংগঠিত বাহিনী এই বিশাল সেনাদলকে কিমানের নিকটে পরাজিত করে। এরপর জিয়াদাতুল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হারুন আল বারানীর বাহিনীকেও আশ-শিঈ পরাজিত করেন। ৯০৯ খ্রিস্টাব্দে জিয়াদাতুল্লাহ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে নিজে আশ-শিঈকে আক্রমণ করলে তিনিও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। জিয়াদাতুল্লাহ মিশর হয়ে বাগদাদে পলায়ন করার পথে রামাল্লায় নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে আগলাবী বংশের পতন ঘটে।
ওবায়দুল্লাহকে মাহদী ঘোষণা ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা
জিয়াদাতুল্লাহকে পরাজিত করার পর আশ-শিঈ ফারাগানা থেকে ইসমাঈলী ইমাম ওবায়দুল্লাহকে আনেন। ৯০৯ খ্রিস্টাব্দে আশ-শিঈ কায়রাওয়ান ও রাক্কাদার মসজিদে ওবায়দুল্লাহকে মাহদী হিসেবে ঘোষণা করেন। আশ-শিঈর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দূরদর্শিতার ফলে ওবায়দুল্লাহ উত্তর আফ্রিকার কায়রাওয়ানের সিংহাসনে আরোহণ করেন। যেহেতু ওবায়দুল্লাহ নিজেকে হযরত ফাতিমা (রা.) এর বংশধর বলে দাবি করেন, তাই তার প্রতিষ্ঠিত খিলাফত ফাতেমীয় খিলাফত নামে পরিচিতি লাভ করে।
উপসংহার
এভাবেই সুদীর্ঘ প্রস্তুতি, কৌশলী প্রচারণা এবং সামরিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ওবায়দুল্লাহ আল মাহদী হলেন প্রথম খলিফা যিনি সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিপক্ষ হিসেবে আফ্রিকায় শিয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই সফলতার পেছনে আবু আবদুল্লাহ আশ-শিঈর সাংগঠনিক তৎপরতা এবং দূরদর্শিতা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। মূলত তার প্রচেষ্টাতেই উত্তর আফ্রিকায় শিয়া মতাদর্শের ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন