মোবাইল দিয়ে ছবি ইডিটের জন্য সেরা ৬টি ফ্রী অ্যাপস
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১০:০১ এএম

স্মার্টফোননির্ভর ফটোগ্রাফি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনা মূল্যের ফটো এডিটিং অ্যাপের চাহিদাও বেড়েছে বহুগুণ। এখন আর পেশাদার মানের ছবি এডিট করার জন্য কম্পিউটার বা দামি সফটওয়্যারের প্রয়োজন হয় না। মোবাইল ফোনেই করা যাচ্ছে সবকিছু, একেবারে বিনা খরচে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলোও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ব্যবহারবান্ধব। ছয়টি জনপ্রিয় ফটো এডিটিং অ্যাপের ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে নিন। এসব অ্যাপ দিয়ে যেকোনো ছবিতে চমক তৈরি করতে পারবেন এবং আপনার সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারবেন খুব সহজেই। এসব অ্যাপ গুগলের প্লে স্টোর ও অ্যাপলের অ্যাপস্টোর থেকে ডাউনলোড করে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
১. স্ন্যাপসিড
গুগলের তৈরি স্ন্যাপসিড অ্যাপ পেশাদার থেকে শুরু করে নবীন সব ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য উপযোগী। স্ন্যাপসিডে আছে ২৯টি টুল ও ফিল্টার যা ছবি এডিট করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এদের মধ্যে রয়েছে হিলিং সুবিধা যা অপ্রয়োজনীয় বস্তু মুছে ফেলার জন্য ব্যবহৃত হয়। অ্যাপের ব্রাশ টুল দিয়ে নির্বাচিত অংশে আলো ও রং নিয়ন্ত্রণ করা যায়। স্ট্রাকচার নামের টুল দিয়ে টেক্সচার বা গঠন স্পষ্ট করা যায় যা ছবিতে গভীরতা যোগ করে। সিলেক্টিভ টুল কন্ট্রোল পয়েন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবির নির্দিষ্ট জায়গায় সূক্ষ্ম এডিট করা যায়। এটি অত্যন্ত কার্যকরী বিশেষ করে যখন শুধুমাত্র ছবির একটি অংশ ঠিক করতে চান।
স্ন্যাপসিডে আরও রয়েছে কার্ভস সুবিধা যার মাধ্যমে আলো ও অন্ধকারের ভারসাম্য ঠিক করা যায়। পারসপেক্টিভ টুলের মাধ্যমে ছবির কোণ বা আকৃতি সংশোধন করা সম্ভব এবং এক্সপ্যান্ড টুলের মাধ্যমে ছবির ক্যানভাস বড় করা যায়। পাশাপাশি লেন্স ব্লার, এইচডিআর স্কেপ ও নানা ধরনের ভিনটেজ বা ফিল্ম ইফেক্টও যোগ করা যায়। এটি জেপিইজি ও র ধরনের ফাইল ফরম্যাটে কাজ করতে পারে এবং এডিট করার সময় ছবির মূল মান অক্ষুণ্ণ রাখে। স্ন্যাপসিডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং কোনো বিজ্ঞাপন বা ইন-অ্যাপ পারচেজ ছাড়াই সব ফিচার পাওয়া যায়।
২. অ্যাডোবি লাইটরুম মোবাইল
অ্যাডোবির জনপ্রিয় পেশাদার সফটওয়্যার লাইটরুমের মোবাইল সংস্করণে রয়েছে উন্নত মানের ছবি এডিট করার সুবিধা। এর বেশির ভাগ টুলই বিনা মূল্যে ব্যবহার করা যায়। ছবি এডিট করতে আলো, ছায়া, কনট্রাস্ট, হোয়াইট ব্যালান্সসহ নানা দিক সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই সুবিধাগুলো পেশাদার ফটোগ্রাফারদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কালার মিক্সচার ও কালার গ্রেডিং টুল ব্যবহার করে রঙের গভীরতা ও ভারসাম্য নির্ধারণ করা সম্ভব। অ্যাপে আরও আছে ক্রপ, রোটেশন ও সাধারণ দাগ দূর করার টুল। পেশাদার মানের অসংখ্য প্রিসেট সহজেই ব্যবহার করা যায় যা কয়েক সেকেন্ডেই ছবির রূপ পাল্টে দিতে পারে।
লাইটরুম মোবাইলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি ক্লাউড সিঙ্কিং সুবিধা দেয় যার ফলে আপনি ফোনে এডিট শুরু করে ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে শেষ করতে পারবেন। সহজ ইন্টারফেসের কারণে অ্যাপটি ব্যবহারে সুবিধাজনক ও দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যায়। অ্যাডোবির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফিচারগুলো যেমন জেনারেটিভ রিমুভ ব্রাশ ছবির অপ্রয়োজনীয় বস্তু মুহূর্তেই মুছে ফেলতে পারে। যারা তাদের ফটো এডিটিংকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান তাদের জন্য লাইটরুম মোবাইল আদর্শ পছন্দ।
৩. পিকসআর্ট
ছবি এডিট, কোলাজ তৈরি আর আঁকার সুবিধা সব মিলিয়ে এক অ্যাপে তিন কাজ করে দেয় পিকসআর্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারের উপযোগী সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরিতে এটি বেশ জনপ্রিয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নির্ভর টুল ব্যবহার করে সহজেই ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন বা অপসারণ করা যায়। এই ফিচারটি বিশেষভাবে কার্যকর যখন আপনি ছবির পেছনের অংশ বদলে নতুন পরিবেশ তৈরি করতে চান। অ্যাপে রয়েছে নানা ধরনের ফিল্টার, আর্টিস্টিক ইফেক্ট, কাস্টমাইজ করা যায় এমন স্টিকার ও আকর্ষণীয় লেখা যুক্ত করার সুবিধা।
পিকসআর্টে কোলাজ লেআউট ও ফ্রি স্টক কনটেন্টও পাওয়া যায় যা ব্যবহারকারীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা। ফ্রি ব্যবহারকারীরাও একাধিক ছবি একসঙ্গে এডিট করতে পারেন এবং তাদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারেন। অ্যাপের এআই এক্সপ্যান্ড ফিচার ব্যবহার করে উল্লম্ব ছবিগুলোকে প্রশস্ত ফরম্যাটে রূপান্তরিত করা যায় যা ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের জন্য আদর্শ। পিকসআর্ট শুধু একটি এডিটিং টুল নয় বরং এটি একটি সম্পূর্ণ সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম যেখানে আপনি আপনার কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন।
৪. পিক্সলার
মোবাইল ও ওয়েব দুই সংস্করণেই পাওয়া যায় পিক্সলার। দ্রুত এডিট থেকে শুরু করে জটিল ছবি এডিট করা সবকিছুই করা যায় এতে। পিক্সলার এক্স মোডে দ্রুত ও এক-ক্লিকে এডিট করা যায় যা ব্যস্ত ব্যবহারকারীদের জন্য উপযুক্ত। পিক্সলার ই মোডে ফটোশপের মতো ডিটেইল কাজ করা যায় যা পেশাদার ফটোগ্রাফারদের প্রয়োজন মেটায়। এতে লেয়ারভিত্তিক এডিটিং এর সুবিধা আছে যা দিয়ে জটিল ডিজাইন তৈরি করা যায়। ক্রপ, রিসাইজ, রং ও আলোর সামঞ্জস্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় অ্যাপ দিয়ে।
এ ছাড়া ডিসপারশন, বোকেহ ও গ্লিচের মতো আর্টিস্টিক ইফেক্ট ব্যবহার করা যায় যা ছবিতে অনন্য স্টাইল যোগ করে। অ্যাপটিতে এআইনির্ভর ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভাল ও জেনারেটিভ টুলও যুক্ত আছে। কিছু উন্নত ফিচার ফ্রি ক্রেডিট ব্যবহারের মাধ্যমেও পাওয়া যায় যা নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য সুবিধাজনক। পিক্সলারের বহুমুখী ব্যবহার এবং দুটি ভিন্ন মোড এটিকে সব ধরনের ব্যবহারকারীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৫. অ্যাডোবি ফটোশপ এক্সপ্রেস
ফটোশপের মোবাইলবান্ধব সংস্করণ হলো অ্যাডোবি ফটোশপ এক্সপ্রেস। দ্রুত ও সহজ এডিটিং এর জন্য এই অ্যাপ উপযুক্ত এবং যারা জটিল সফটওয়্যারে সময় দিতে চান না তাদের জন্য আদর্শ। সাধারণ এডিটিং এর পাশাপাশি এক ক্লিকে দাগ বা অপ্রয়োজনীয় অংশ মুছে ফেলা যায়। এ ছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ড বদলানো, ছবি সোজা করা ও আলোর ভারসাম্য ঠিক করার সুযোগ রয়েছে। অ্যাপের লুকস নামের ফিল্টার ও ইফেক্ট দিয়ে মুহূর্তেই ছবির মুড বদলে ফেলা যায়। এতে রয়েছে কোলাজ মেকার যেখানে নানা গ্রিড ও বর্ডার স্টাইল বেছে নেওয়া যায়। ফটোশপ এক্সপ্রেস তাদের জন্য উত্তম যারা দ্রুত কিন্তু মানসম্পন্ন এডিটিং করতে চান এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য দ্রুত কনটেন্ট তৈরি করতে চান।
৬. ভিএসসিও
ভিএসসিও হলো ফিল্টারভিত্তিক ফটো এডিটিং এর জন্য একটি জনপ্রিয় অ্যাপ যা বিশেষভাবে ফিল্ম ইমুলেশনের জন্য পরিচিত। অ্যাপটি মূলত ফিল্ম স্টক অনুকরণকারী লাইটরুম প্রিসেট তৈরির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল এবং পরে একটি শক্তিশালী মোবাইল এডিটর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভিএসসিওতে রয়েছে শত শত প্রিসেট যা কোডাক পোরট্রা, ফুজি এবং ইলফোর্ড ফিল্ম স্টকের প্রকৃত রূপ ফুটিয়ে তোলে। অন্যান্য ফিল্টারভিত্তিক অ্যাপের তুলনায় ভিএসসিওর সব প্রিসেটই সুচিন্তিত এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে।
ভিএসসিওর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি ছবিতে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শিল্পসম্মত রূপ দিতে পারে। অ্যাপের নতুন টোন স্প্লিট ফিচার ব্যবহার করে দুই রঙের গ্রেডিং করা যায় যা ফিল্মের মতো বাস্তবসম্মত ফলাফল দেয়। ভিএসসিওর সৃজনশীল কমিউনিটি অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের তুলনায় ভিন্ন কারণ এখানে প্রকৃত মতামত পাওয়া যায়, শুধু লাইকের সংখ্যা নয়। যারা তাদের সব ছবিতে একটি নির্দিষ্ট এবং পেশাদার স্টাইল বজায় রাখতে চান তাদের জন্য ভিএসসিও একটি চমৎকার পছন্দ।
মোবাইল ফটোগ্রাফি এখন শুধুমাত্র একটি শখ নয় বরং এটি অনেকের জন্য পেশাদার কাজের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই ছয়টি অ্যাপ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। স্ন্যাপসিড যদি আপনার সম্পূর্ণ বিনামূল্যের এবং শক্তিশালী টুল চান। লাইটরুম মোবাইল যদি আপনি পেশাদার মানের এডিট এবং ক্লাউড সিঙ্কিং চান। পিকসআর্ট যদি আপনি সৃজনশীল এবং সামাজিক মাধ্যমবান্ধব কনটেন্ট তৈরি করতে চান। পিক্সলার যদি আপনি দ্রুত এবং জটিল উভয় ধরনের এডিট চান। ফটোশপ এক্সপ্রেস যদি আপনি সহজ এবং দ্রুত এডিটিং পছন্দ করেন। এবং ভিএসসিও যদি আপনি ফিল্মের মতো শিল্পসম্মত ছবি তৈরি করতে চান। প্রতিটি অ্যাপেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং সুবিধা রয়েছে তাই আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অ্যাপটি বেছে নিন এবং আপনার ফটোগ্রাফি দক্ষতা আরও উন্নত করুন।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন