KOFIPOST

KOFIPOST

ধুলো-দূষণের যুগে ফুসফুস রক্ষায় আদা লাল চা, জানুন প্রতিদিন পানের উপকারিতা

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
ধুলো-দূষণের যুগে ফুসফুস রক্ষায় আদা লাল চা, জানুন প্রতিদিন পানের উপকারিতা
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক জীবনযাত্রার ছন্দে প্রতিদিন আমাদের শরীর বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষত শহুরে পরিবেশে বায়ু দূষণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে ফুসফুসের স্বাস্থ্য ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে। অল্প বয়সেই শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এসবের পাশাপাশি ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকিও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার বর্জ্য এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সম্মিলিত প্রভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের ফুসফুসের উপর চাপ বাড়ছে।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

তবে এই পরিস্থিতিতে আশার আলো হতে পারে আমাদের হাতের কাছে থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতিদিনের খাবারে কিছু নির্দিষ্ট উপাদান রাখলে ফুসফুসকে পরিষ্কার ও সক্রিয় রাখা সম্ভব। এদের মধ্যে অন্যতম হলো আদা এবং লাল চা বা রেড টি-র সমন্বয়ে তৈরি একটি বিশেষ পানীয়।

আদা লাল চা কেন বিশেষ কার্যকর

ঘরোয়া চিকিৎসার প্রাচীন ঐতিহ্যে আদা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উপাদান হিসেবে পরিচিত। সর্দি-কাশি, জ্বর, মাথাব্যথা বা হজমের সমস্যায় আদা চা পান করার প্রথা প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে। কিন্তু আদার গুণাগুণ এর চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। বিশেষত ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ভালো রাখতে এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধে আদা অসাধারণ কার্যকর।

অপরদিকে লাল চা বা রেড টি তে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল দূর করতে সাহায্য করে। এই দুটি উপাদানের সমন্বয় যখন একসাথে ব্যবহার করা হয়, তখন তা ফুসফুসের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। আদার মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুনাশক উপাদান এবং লাল চায়ের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট একত্রে ফুসফুসকে সুরক্ষিত রাখে এবং শ্বাসতন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

আদার রাসায়নিক উপাদান ও ফুসফুসে এর প্রভাব

আদার মধ্যে রয়েছে জিঞ্জেরল এবং শোগোল নামক দুটি শক্তিশালী জৈব-সক্রিয় উপাদান। এই উপাদানগুলো ফুসফুসের প্রদাহ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হলো শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং শ্বাসকষ্ট বাড়াতে পারে। জিঞ্জেরল এবং শোগোল এই প্রদাহ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে।

এছাড়াও আদায় রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাগনেশিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। লাল চায়ের পলিফেনল এবং ক্যাটেচিন শ্বাসতন্ত্রের কোষগুলোকে সুরক্ষিত রাখে এবং ক্ষতিকর টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। দূষণ ও ধূমপানের ফলে যে ক্ষতিকর পদার্থ ফুসফুসে জমা হয়, এই পানীয় সেগুলো পরিষ্কার করতে অবদান রাখে।

বায়ু চলাচল পথ সহজ ও প্রসারিত করা

ফুসফুসের প্রধান কাজ হলো রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ করা এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ার জন্য শ্বাসনালী এবং ব্রঙ্কিয়াল টিউবগুলোর সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি। টাটকা আদা কুচিয়ে লাল চায়ের সাথে ফুটিয়ে পান করলে যে হালকা ঝাঁঝালো এবং উষ্ণ অনুভূতি হয়, তা শুধু গলায় আরাম দেয় না, বরং শ্বাসনালীর পথগুলোকেও পরিষ্কার করে।

আদার মধ্যে থাকা প্রদাহনাশক উপাদান ফুসফুসের বায়ু চলাচল পথকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে। বায়ু দূষণ, অ্যালার্জি বা সংক্রমণের কারণে অনেক সময় এই পথগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। নিয়মিত আদা লাল চা পান করলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। লাল চায়ের উষ্ণতা এবং আদার প্রাকৃতিক উপাদান মিলে শ্বাসনালীর মাংসপেশি শিথিল করে এবং অক্সিজেন প্রবাহ বৃদ্ধি করে।

শ্বাসকষ্ট ও কাশিতে আরাম

কাশি হলে বা দূষিত বাতাসে শ্বাস নিলে ফুসফুসে জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসকষ্ট হয় এটি একটি সাধারণ সমস্যা। বিশেষত শীতকালে বা ঋতু পরিবর্তনের সময় এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। আদা লাল চা এই পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক আরাম প্রদান করতে পারে। আদার প্রাকৃতিক উপাদান ফুসফুসের বাতাস চলাচলের পথগুলো পরিষ্কার করে দিতে সক্ষম এবং জমে থাকা কফ বের করতে সাহায্য করে। লাল চায়ের উষ্ণতা গলা ও বুকের জমাট অনুভূতি কমায় এবং শ্লেষ্মা নিঃসরণ সহজ করে। একইসাথে আদার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। যারা দীর্ঘদিন ধরে কাশি বা গলার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই পানীয় বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

হাঁপানি ও সিওপিডি রোগীদের জন্য সহায়ক

হাঁপানি বা অ্যাজমা এবং ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি হলো দুটি দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ যেখানে শ্বাস নিতে অত্যন্ত কষ্ট হয়। এই রোগগুলোতে ফুসফুসের বাতাস চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায় এবং প্রদাহ দেখা দেয়। যদিও এসব রোগের চিকিৎসা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিয়ে করতে হয়, তবে প্রাকৃতিক উপাদান যেমন আদা এবং লাল চা শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। গরম আদা লাল চা পান করলে ফুসফুসের পেশিগুলো শিথিল হয় এবং বাতাস চলাচল সহজ হয়ে যায়। এটি বিশেষত সকালে বা ঘুম থেকে ওঠার পর পান করলে সারাদিনের জন্য শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখা জরুরি যে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং একটি সম্পূরক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের ভূমিকা

লাল চায়ে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শুধুমাত্র ফুসফুসের জন্যই নয়, সমগ্র শরীরের জন্য উপকারী। ফ্রি র্যাডিক্যাল হলো অস্থিতিশীল অণু যা কোষের ক্ষতি করে এবং বয়স বৃদ্ধি ও বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। দূষণ, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যালের পরিমাণ বাড়ায়। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এই ফ্রি র্যাডিক্যালগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে এবং কোষকে সুরক্ষিত রাখে। লাল চায়ের পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েড ফুসফুসের কোষগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। আদার সাথে মিলে এই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নিয়মিত এই পানীয় পান করলে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষা পায় এবং বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি কমে।

প্রস্তুতি ও পান করার পদ্ধতি

আদা লাল চা তৈরি করা অত্যন্ত সহজ। এক কাপ পানীয়ের জন্য এক ইঞ্চি পরিমাণ টাটকা আদা নিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে পাতলা স্লাইস বা কুচি করে নিতে হবে। একটি পাত্রে দুই কাপ পানি নিয়ে তাতে আদার টুকরো এবং এক চা চামচ লাল চা পাতা দিতে হবে। মাঝারি আঁচে পানি ফুটতে দিয়ে পাঁচ থেকে সাত মিনিট সিদ্ধ করতে হবে যাতে আদা ও চায়ের সমস্ত উপাদান পানিতে মিশে যায়। এরপর ছেঁকে নিয়ে হালকা গরম অবস্থায় পান করা উচিত। স্বাদ বাড়ানোর জন্য সামান্য মধু বা লেবুর রস মেশানো যেতে পারে, যা অতিরিক্ত পুষ্টিগুণও যোগ করবে। তবে চিনি এড়িয়ে চলা ভালো কারণ চিনি প্রদাহ বাড়াতে পারে। সকালে খালি পেটে বা সন্ধ্যায় এই চা পান করলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

যদিও আদা লাল চা অত্যন্ত উপকারী, তবুও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যারা পেটের আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত আদা সমস্যা বাড়াতে পারে। গর্ভবতী নারীদের আদা পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করছেন, তাদের জন্যও আদা সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা উচিত কারণ এটি রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের কোনো জটিল সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আদা লাল চা একটি প্রাকৃতিক সহায়ক হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এটি কখনো চিকিৎসা ওষুধের বিকল্প নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলাই সর্বোত্তম।

জীবনযাত্রায় অন্যান্য পরিবর্তন

ফুসফুস সুস্থ রাখতে শুধু আদা লাল চা পান করলেই হবে না, পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি। ধূমপান সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা উচিত এবং পরোক্ষ ধূমপান থেকেও দূরে থাকতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম বিশেষত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায়। প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটা, যোগব্যায়াম বা প্রাণায়াম অভ্যাস করা ভালো। খাদ্যতালিকায় তাজা ফলমূল, শাকসবজি এবং পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মসলা এবং ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যায় এবং ফুসফুস পরিষ্কার থাকে। ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে গাছপালা রাখা এবং নিয়মিত ঘর পরিষ্কার করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা

নিয়মিত আদা লাল চা পান করলে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা অনেক ভালো থাকে। এটি শুধু বর্তমান সমস্যার সমাধান করে না, ভবিষ্যতে রোগের ঝুঁকিও কমায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফুসফুসের ক্ষমতা কমতে থাকে, কিন্তু সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার এই প্রক্রিয়া ধীর করতে পারে। আদা ও লাল চায়ের সমন্বয়ে তৈরি এই পানীয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সংক্রমণ প্রতিরোধ, প্রদাহ কমানো এবং কোষের ক্ষতি রোধ করা এই তিনটি ক্ষেত্রে এই পানীয় বিশেষভাবে কার্যকর। তাই প্রতিদিনের রুটিনে এক কাপ আদা লাল চা যুক্ত করা একটি স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বর্তমান সময়ে যখন বায়ু দূষণ এবং জীবনযাত্রার চাপ ক্রমশ বাড়ছে, তখন প্রাকৃতিক উপায়ে নিজের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আদা লাল চা এমন একটি সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর উপায় যা ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে সুস্থ থাকার জন্য শুধুমাত্র একটি উপাদানের উপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন