ঐতিহাসিক রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড, রাজসাক্ষীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ৯:২০ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আজ সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে।
ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ৪৫৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে মোট ছয়টি অংশ রয়েছে।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল জানায়, দুটি অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি অভিযোগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেগুলো হলো গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ প্রদান।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে তার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তিনি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে পলাতক এবং ভারতে অবস্থান করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথম মামলাটি করা হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ শুরু হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর এবং সেদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
চলতি বছরের ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে দেড় হাজার নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা এবং ৩০ হাজার মানুষকে আহত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ১ জুন প্রসিকিউশন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।
এই মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ মোট ৫৪ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় গত ৮ অক্টোবর। এরপর ১২ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ২৩ অক্টোবর শেষ হয়। সবশেষ গত ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় ঘোষণার জন্য আজ ১৭ নভেম্বর তারিখ ধার্য করে।
রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার সর্বোচ্চ শাস্তির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্কের বিবরণ তুলে ধরেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং পরবর্তীতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করে হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, বাড্ডা, সাভার, আশুলিয়া, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যার ভিডিও ও তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া গণঅভ্যুত্থান চলাকালে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার টেলিফোনে কথোপকথনও শোনানো হয়।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার জানান, পলাতক থাকায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল এই সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন না। ট্রাইব্যুনাল আইনে স্পষ্ট বলা আছে, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। তবে আপিলের সুযোগ নিতে হলে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আত্মসমর্পণ করতে হয় অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হতে হয়।
রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদেরা ন্যায়বিচার পেয়েছে এবং রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর এজলাস থেকে রায় ঘোষণার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন।
রায় ঘোষণার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বড় পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও জনতা শেখ হাসিনার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেন। একইভাবে ট্রাইব্যুনালের বাইরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুর দিকে শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যের অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায় যে তিনি ২২৬ জনকে হত্যার লাইসেন্স পেয়ে গেছেন। এই বক্তব্য বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা উল্লেখ করে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়। সেই মামলায় গত ২ জুলাই শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন