KOFIPOST

KOFIPOST

ইতিহাস

রেনেসাঁ দর্শনের বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? ব্যাখ্যা কর।

মোঃ আব্দুল  আলিম
অ+
অ-
রেনেসাঁ দর্শনের বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকাঃ মানব সভ্যতার ইতিহাসে কিছু কিছু শব্দ আছে যেগুলো শুধু শব্দ নয়, বরং একটা পুরো যুগের প্রতীক। 'রেনেসাঁ' তেমনই একটি জাদুকরী শব্দ। কল্পনা করুন, মধ্যযুগের অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে হঠাৎ করে খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়ানো রেনেসাঁ ছিল ঠিক এমনই এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

প্রাচীনকালে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলের মতো দার্শনিকরা জ্ঞানের যে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, টলেমি, আর্কিমিডিসরা বিজ্ঞানে যে বিপ্লব এনেছিলেন - সেসব যেন মধ্যযুগে এসে হারিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারের গহ্বরে। কিন্তু ১৪৫৩ থেকে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ - এই আড়াইশো বছরে ইতিহাস নতুন করে লেখা হলো। এই সময়টাকেই বলা হয় রেনেসাঁর স্বর্ণযুগ।

রেনেসাঁঃ

'রেনেসাঁ' শব্দটার মানে 'পুনর্জন্ম'। কিন্তু এটা শুধু প্রাচীন গ্রিক আর রোমান সাহিত্যের পুনরাবিষ্কার ছিল না। এটা ছিল মানুষের চিন্তাজগতের এক বিশাল জাগরণ।প্রাচীন জ্ঞান-ভাণ্ডারের প্রতি মানুষের হঠাৎ করে তীব্র আগ্রহ জন্মাল। কিন্তু শুধু পড়েই ক্ষান্ত হলো না মানুষ - তারা প্রশ্ন করতে শুরু করল, যুক্তি দিয়ে যাচাই করতে লাগল, আর যা ভালো তা গ্রহণ করল। এই সমালোচনামূলক চিন্তা, এই অনুসন্ধিৎসা - এটাই রেনেসাঁর প্রাণশক্তি।

ঐতিহাসিক Davies যথার্থই বলেছেন, "রেনেসাঁ মানে হলো মানুষের স্বাধীনতাপ্রিয়, দুঃসাহসিক চিন্তাভাবনার পুনর্জাগরণ, যা মধ্যযুগে শিকলে বাঁধা ছিল।"

রেনেসাঁ শুধু কোনো একটা বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, দর্শন, সাহিত্য - সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল নতুন চেতনার ঢেউ। মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করল একটা ধর্মনিরপেক্ষ, স্বাধীন জীবনের। ব্যক্তির মর্যাদা, তার নিজস্ব পরিচয় - এগুলো হয়ে উঠল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই রেনেসাঁকে বলা হয় জগৎ ও জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।

রেনেসাঁ দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোঃ

১. মানবতাবাদ

রেনেসাঁর হৃদয়ে ছিল মানবতাবাদ। মধ্যযুগে সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল ধর্ম আর ঈশ্বর। কিন্তু রেনেসাঁ বলল - "না, মানুষকে নিয়ে ভাবো। মানুষের জীবন, তার সমাজ, তার সম্ভাবনা - এগুলোই আসল।" প্রাচীন গ্রিক-রোমান সাহিত্য পড়তে গিয়ে মানুষ বুঝল, ধর্ম ছাড়াও জ্ঞানচর্চা সম্ভব। মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে আলোচনা করাটাই হয়ে উঠল মূল বিষয়।

এই মানবতাবাদ তিনটি ধারায় বিকশিত হলোঃ

  • পেত্রার্কের পুনর্জন্মবাদ
  • পৌর মানবতাবাদ
  • নতুন ধাতুত্ববাদ

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের আত্মার ওপর নিয়ন্ত্রণ, সত্য অনুসন্ধান - এসব হয়ে উঠল নতুন আদর্শ। পেত্রার্ক, পোপ ফ্রান্সিস বেকনের মতো চিন্তাবিদরা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেন।

২. ব্যক্তিত্বের বিস্ফোরণ

রেনেসাঁর আগে মানুষ ছিল যেন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটা মুখ। কিন্তু রেনেসাঁ প্রতিটি মানুষকে বলল - "তুমি অনন্য! তোমার নিজস্ব পরিচয় আছে, প্রতিভা আছে - তা প্রকাশ করো!" শিল্পকলায় মাইকেল অ্যাঞ্জেলা তাঁর অসাধারণ ভাস্কর্যে, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তাঁর মোনালিসায়, রাফাইল তাঁর চিত্রকলায় নিজেদের স্বতন্ত্র শৈলী তুলে ধরলেন। সাহিত্যে পেত্রার্ক, ইরাসমাস, বোকাচ্চ - প্রত্যেকেই হয়ে উঠলেন এক একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। মেডিসি পরিবারের মতো শিল্পানুরাগীরা শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেন। ব্যক্তিত্ব আর স্বকীয়তাই হয়ে উঠল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

৩. যুক্তির আলোয় সবকিছু

"এটা সত্য কারণ পুরোহিত বলেছেন" - এই যুগ শেষ হলো। রেনেসাঁর মানুষ বলল, "আমি যাচাই করব, যুক্তি দিয়ে বুঝব, তারপর বিশ্বাস করব।" মধ্যযুগের অনেক বিশ্বাস, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অটুট ছিল, সেগুলো যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করা হলো। আর দেখা গেল, অনেক কিছুই ভিত্তিহীন! এই যুক্তিবাদী মানসিকতাই পরবর্তীকালে আলোকময় যুগের (Enlightenment) পথ প্রশস্ত করল।

৪. ধর্মনিরপেক্ষতাঃ

রেনেসাঁর সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। মধ্যযুগের মানুষ সারাজীবন পরকালের চিন্তায় কাটাত। কিন্তু রেনেসাঁ বলল - "এই জীবনটাও তো গুরুত্বপূর্ণ! এখানে, এই মুহূর্তে যা ঘটছে, তাও তো মূল্যবান!" শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি - সবকিছু থেকেই ধর্মের একচেটিয়া দখল সরে গেল। মানুষ নিজেকে নিয়ে ভাবতে শিখল। ইহজাগতিক সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করল।

গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের ভোগবাদী তত্ত্ব নতুন করে জনপ্রিয় হলো। লরেন্স দ্যা ম্যাগনিফিসেন্টের একটি বিখ্যাত উক্তিতে সেই যুগের মানসিকতা প্রকাশ পায়: "যে সুখী হতে চায়, সে এখনই সুখী হোক - কারণ আগামীকাল কী হবে তা নিশ্চিত নয়।"

৫. সাহিত্যে নতুন জোয়ার

রেনেসাঁর সাহিত্য হয়ে উঠল জীবনমুখী। দেবদেবীর গল্প নয়, বরং রক্ত-মাংসের মানুষের গল্প। তাদের প্রেম, দুঃখ, আনন্দ, সংগ্রাম - এসবই সাহিত্যের বিষয় হয়ে উঠল। পেত্রার্কের তিন শতাধিক সনেট প্রেমের কত না রূপ তুলে ধরল। বোকাচ্চর 'ডেকামেরন' জীবনের নানা রঙ এঁকে দিল। স্পেন্সারের 'দ্য ফেয়ারী কুইন' কল্পনা আর বাস্তবের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাল।

৬. চিত্রকলায় বিপ্লব

মধ্যযুগের চিত্রকলা ছিল সমতল, প্রাণহীন। কিন্তু রেনেসাঁর শিল্পীরা ক্যানভাসে প্রাণ ফুঁকে দিলেন। আলো-ছায়ার খেলা, মানবদেহের নিখুঁত অনুপাত, গভীরতার অনুভূতি - সবকিছু মিলিয়ে চিত্রকলা হয়ে উঠল যেন বাস্তবতার প্রতিফলন। শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, প্রকৃতি, সাধারণ মানুষ, দৈনন্দিন জীবনও উঠে এল ছবিতে। মাসাচ্চো, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, রাফাইল, মাইকেল অ্যাঞ্জেলা, টাইটিয়ান - এই নামগুলো হয়ে উঠল শিল্পকলার সমার্থক। ভাস্কর্যে দোনাতেলো আর অ্যাঞ্জেলা, স্থাপত্যে ব্রামান্টে নিয়ে এলেন নতুন মাত্রা।

৭. বিজ্ঞানের নবজাগরণ

রেনেসাঁর বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে মেতে উঠলেন। তাঁরা শুধু পুরনো বই পড়লেন না, নিজেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। কোপার্নিকাস বললেন - "পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্র।" গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নতুন সত্য আবিষ্কার করলেন। কেপলার গ্রহদের গতিপথ বুঝলেন। এসব আবিষ্কার পুরো মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বদলে দিল।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যঃ

রেনেসাঁর সাথে সাথে আরও কিছু বড় পরিবর্তন এল:-

  • মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান - ব্যবসায়ী, কারিগর, পেশাজীবীরা হয়ে উঠলেন সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ
  • জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম - ছোট ছোট রাজ্যের বদলে শক্তিশালী জাতি-রাষ্ট্র গড়ে উঠল
  • ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার - নতুন বাণিজ্য পথ আবিষ্কার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
  • মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার - জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের কাছে
  • কম্পাসের ব্যবহার - দূর সমুদ্রে যাত্রা সম্ভব হলো

উপসংহারঃ

রেনেসাঁ শুধু একটা ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটা ছিল মানব চেতনার এক মহাবিপ্লব। মাত্র আড়াইশো বছরে ইউরোপ বদলে গেল চেনা যায় না এমন। অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ দাঁড়াল আলোর মধ্যে। রেনেসাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো - এটা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাল, স্বপ্ন দেখতে শেখাল, নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখাল। ধর্মান্ধতার শিকল ভেঙে মানুষ পেল চিন্তার স্বাধীনতা, সৃষ্টির স্বাধীনতা।

আজকের আধুনিক বিশ্ব, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে, যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মানবাধিকার মূল্যবান - সেই বিশ্বের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল রেনেসাঁর সেই উজ্জ্বল দিনগুলোতে। রেনেসাঁ শেষ হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার চেতনা আজও বেঁচে আছে প্রতিটি মুক্তচিন্তায়, প্রতিটি সৃজনশীল কাজে, প্রতিটি প্রশ্নে যা আমরা করি। আর তাই রেনেসাঁ চিরকালীন - এটা শুধু অতীত নয়, এটা আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতও।

ট্যাগস:

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাসইউরোপীয় ইতিহাসইতিহাসডিগ্রি

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন