KOFIPOST

KOFIPOST

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাস

উপনিবেশিক শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও এর ফলাফল ব্যাখ্যা কর।

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
উপনিবেশিক শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও এর ফলাফল ব্যাখ্যা কর।
ছবি: সংগৃহীত

ভূমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের আগমন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ছিল না, এটি ছিল এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় জীবনে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা। ব্রিটিশ শাসনের আগে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ছিল। যদিও রাজনৈতিক সংঘাত বা দ্বন্দ্ব কখনো কখনো দেখা যেত, কিন্তু আধুনিক অর্থে যাকে সাম্প্রদায়িকতা বলা হয়, তার অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী ও পাকাপোক্ত করার জন্য এমন কিছু নীতি গ্রহণ করে, যা এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

উপনিবেশিক শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভবের কারণ

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভবের পেছনে বহুবিধ এবং জটিল কারণ বিদ্যমান ছিল। এর মধ্যে ব্রিটিশদের গৃহীত নীতি এবং তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

  • ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি: ব্রিটিশ শাসকদের অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ (Divide and Rule) নীতি। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, ভারতের প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়, হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে যদি ঐক্য বজায় থাকে, তবে তাদের শাসন চালানো কঠিন হবে। তাই তারা সুকৌশলে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ ও অবিশ্বাস তৈরি করে নিজেদের শাসনকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করে। এই নীতির মাধ্যমে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে প্রশ্রয় দিত এবং কখনো কখনো উসকেও দিত।
  • বৈষম্যমূলক নীতি ও হিন্দু তোষণ: ব্রিটিশরা মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করেছিল বলে প্রথম থেকেই তারা মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত। অন্যদিকে, হিন্দুদেরকে তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজেদের সমর্থক গোষ্ঠী হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করে। সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হিন্দুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে হিন্দু সম্প্রদায় তুলনামূলকভাবে অগ্রসর হতে শুরু করে এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি বড় আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়। এই বৈষম্য মুসলমানদের মনে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করে এবং হিন্দুদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ বাড়িয়ে তোলে, যা সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়।
  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব: ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার ফলে মূলত হিন্দু জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যারা ব্রিটিশদের অনুগত ছিল। অন্যদিকে, প্রজাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। হিন্দু জমিদারদের অধীনে মুসলমান প্রজাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়।
  • বঙ্গভঙ্গ: ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত সাম্প্রদায়িক বিভেদকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও প্রশাসনিক কারণ দেখানো হয়েছিল, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে দেওয়া। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানরা উপকৃত হবে ভেবে এর পক্ষে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায় এর তীব্র বিরোধিতা করে স্বদেশী আন্দোলন শুরু করে। এই ঘটনা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করে।
  • পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা: ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী, মুসলমান ভোটাররা কেবল মুসলমান প্রার্থীদেরই ভোট দিতে পারত। এটি সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
  • ধর্মভিত্তিক সংগঠনের উত্থান: ব্রিটিশদের নীতির ফলে হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। একদিকে যেমন হিন্দু মহাসভার মতো সংগঠন তৈরি হয়, তেমনই অন্যদিকে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনগুলো নিজ নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থ নিয়ে রাজনীতি শুরু করলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হয়।

সাম্প্রদায়িকতার ফলাফল

ঔপনিবেশিক শাসনামলে সৃষ্ট এই সাম্প্রদায়িকতার পরিণতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী।

  • সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট: শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে যায়। উভয় সম্প্রদায় একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, যার ফলে অবিশ্বাস ও শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি হয়।
  • দ্বিজাতি তত্ত্ব ও দেশভাগ: সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চূড়ান্ত পরিণতি ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের উত্থান। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে দাবি করা হয় যে, হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি এবং তাদের জন্য দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন। এর ফলস্বরূপ, ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
  • দেশত্যাগ ও মানবিক বিপর্যয়: দেশভাগের ফলে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম মানবিক বিপর্যয় ঘটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। এই সহিংসতায় অগণিত মানুষ প্রাণ হারায়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশদের গৃহীত ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি এবং তাদের সৃষ্ট বৈষম্যই ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেছিল। যা সময়ের সাথে সাথে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয় এবং এর চূড়ান্ত ফল ছিল রক্তক্ষয়ী দেশভাগ। ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করেছিল, তার ক্ষত আজও এই অঞ্চলের দেশগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে রয়ে গেছে।

ট্যাগস:

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাসডিগ্রি সাজেশনডিগ্রি

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন