ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকটের কারণ ও সমাধান
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ২১ নভেম্বর ২০২৫, ২:৫০ পিএম

বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে ঢাকা দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে চলেছে। শহরটির বাসযোগ্যতা এখন একটি গুরুতর বিষয় হয়ে উঠেছে, যা লক্ষ লক্ষ বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান প্রভাবিত করছে। ঢাকার অবসবাসযোগ্য অবস্থার পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ এবং এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। নগর পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ নাগরিক—সবার জন্যই এটি একটি উদ্বেগের বিষয়।
বাসযোগ্যতা সংকটের কারণ
ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকটের কারণগুলো বহুমুখী এবং আন্তঃসম্পর্কিত। সবচেয়ে বড় এবং মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ (Unplanned Urbanization) ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ।
১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সুশাসনের অভাব
- পরিকল্পনার অভাব ও দুর্বল বাস্তবায়ন: ঢাকা একটি পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বড় বড় মেগা প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া হলেও, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP) এবং অন্যান্য নগর উন্নয়ন আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন খুবই দুর্বল।
- নগর সুশাসনের অভাব: সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্বল নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির অভাব রয়েছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই বাসযোগ্যতা বাড়ে না; এর জন্য নগর সুশাসন অপরিহার্য।
- উন্মুক্ত স্থান হ্রাস: অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে পার্ক, খেলার মাঠ এবং সবুজ স্থান প্রায় বিলুপ্তির পথে। এটি মানসিক সুস্থতা এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
২. অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ
- অনিয়ন্ত্রিত মাইগ্রেশন: কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনযাত্রার আশায় প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় চলে আসছে। এই অপরিকল্পিত আগমনের ফলে শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে।
- অবকাঠামোতে চরম চাপ: বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সব ধরনের সেবার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
৩. পরিবেশ দূষণ
- বায়ু দূষণ: ঢাকা নিয়মিত বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় থাকে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- যানবাহনের নির্গমন: অপরিমিত ও পুরাতন যানবাহনের ধোঁয়া।
- নির্মাণকাজের ধুলোবালি: অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং ধুলা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা।
- শিল্প কারখানার বর্জ্য: অপরিকল্পিতভাবে শিল্প কারখানা স্থাপন।
- জল দূষণ: অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য (Effluents) এবং পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য সরাসরি নদী ও জলাশয়ে ফেলা হয়। এতে বুড়িগঙ্গা সহ অন্যান্য নদী দূষিত হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর হ্রাস পাচ্ছে।
৪. দুর্বল অবকাঠামো ও পরিষেবা
- ভয়াবহ যানজট: অপরিমিত ব্যক্তিগত যানবাহন, অপর্যাপ্ত সড়ক সংখ্যা এবং অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থার (যেমন- বাসগুলোতে শৃঙ্খলা না থাকা) কারণে যানজট দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা: প্রতিদিন উৎপাদিত হাজার হাজার টন বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্পত্তি করার আধুনিক ব্যবস্থা নেই। রাস্তার পাশে ও নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- স্বাস্থসেবা ও শিক্ষার মান: জনসংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সুবিধার অভাব রয়েছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং নগর সুশাসনের ঘাটতি হলো সেই ভিত্তি, যার উপর অতিরিক্ত জনসংখ্যা, পরিবেশ দূষণ এবং দুর্বল পরিষেবাগুলো একত্রিত হয়ে ঢাকার বাসযোগ্যতাকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
ঢাকার বাসযোগ্যতা সঙ্কটের মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি জটিল সমস্যা, যা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।
- ১. অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি: অবকাঠামোর উপর চাপ ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনযাত্রার আশায় ঢাকায় চলে আসে। এই অপরিকল্পিত আগমনের ফলে আবাসন, যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য অপরিহার্য সেবার উপর অসাধারণ চাপ পড়েছে। শহরের অবকাঠামো এত দ্রুত বৃদ্ধি পায়নি, যা শহরজুড়ে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
- ২. বায়ু দূষণ: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক বায়ু দূষণ ঢাকার বাসযোগ্যতার একটি অন্যতম প্রধান বাধা। শহরটি নিয়মিত বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় স্থান করে নেয়। যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলোবালি, শিল্প কারখানার বর্জ্য এবং রাস্তায় জ্বালানি জ্বলানো এই দূষণের প্রধান উৎস। এই মারাত্মক বায়ু দূষণ শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে।
- ৩. ভয়াবহ যানজট: সময়ের অপচয় ও মানসিক চাপ যাতায়াত ব্যবস্থা ঢাকায় আরেকটি বড় সংকট। শহরের রাস্তায় অপরিমিত যানবাহন, সেই অনুযায়ী সড়ক সংখ্যার অভাব এবং দুর্বল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা দীর্ঘ যানজট তৈরি করেছে। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিকে আটকে থাকে, যা তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে। এটি অর্থনৈতিক ক্ষতিরও একটি প্রধান কারণ।
- ৪. জল ও পয়ঃনিষ্কাশন সঙ্কট: নিরাপদ জলের অভাব জল সরবরাহ ও পানীয় জলের গুণমান ঢাকায় আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত আহরণ ভূগর্ভস্থ জলের স্তর হ্রাস করেছে। এছাড়াও, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা নদী এবং অন্যান্য জলজ সম্পদকে দূষিত করেছে। এই সব কারণে জনগণ নিরাপদ পানীয় জল পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে।
- ৫. ত্রুটিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ দূষণের মূল কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঢাকার আরেকটি গুরুতর সমস্যা। প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, কিন্তু এর সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। রাস্তার পাশে, ড্রেইন এবং সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলা হয়, যা পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে।
সমাধান?
এই সব সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার এবং প্রশাসনিক বিভাগকে বেশ কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
- ১. অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ: সরকারকে ঢাকার বাইরে অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ ঢাকায় আসার প্রয়োজন কমে। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট এবং অন্যান্য শহরে শিল্প ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করলে দেশের মানুষ আরও ভালোভাবে বিতরণ হবে।
- ২. গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি: ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে হবে। মেট্রো রেল সম্প্রসারণ, বাস দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা (BRT) এবং অন্যান্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অপশন যোগ করলে যানজট কমানো সম্ভব। বেসরকারি যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে সর্বজনীন পরিবহনকে উৎসাহিত করতে হবে।
- ৩. বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ: বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। নির্মাণকাজে সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার, যানবাহনের নিঃসরণ মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। পাশাপাশি, শহরজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সম্প্রসারিত করলে বায়ু পরিশুদ্ধিকরণে সহায়তা পাওয়া যাবে।
- ৪. জল সরবরাহ আধুনিকীকরণ: পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করতে হবে। পানি বিতরণ নেটওয়ার্কের ফাঁস প্লাগ করা, পানি শোধনাগার স্থাপন এবং উন্নত জল চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এছাড়াও, বর্ষার জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে জল সংকট কমানো সম্ভব হবে।
- ৫. আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা (Waste Segregation), কম্পোস্টিং ব্যবস্থা চালু করা এবং সীমিত এলাকায় আধুনিক বর্জ্য প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা উচিত। জনগণকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
- ৬. সবুজ স্থানের সম্প্রসারণ: শহরের সবুজ স্থান বৃদ্ধি করতে হবে। পার্ক, বাগান এবং খোলা জায়গা তৈরি করলে মানুষের মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশও উন্নত হবে।
- ৭. সাশ্রয়ী আবাসন: আবাসন সমস্যা সমাধানে সাশ্রয়ী হাউজিং প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
- ৮. কঠোর নগর পরিকল্পনা: নগর পরিকল্পনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ প্রদান করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা রোধ করতে হবে এবং বিদ্যমান নগর পরিকল্পনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই সব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। সরকার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া ঢাকার বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। শহরটিকে আবার বাসযোগ্য করে তুলতে এখনই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। ঢাকাকে একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য।
ট্যাগস:
ঢাকাকফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন