KOFIPOST

KOFIPOST

ফ্রিল্যান্সিং কী? নতুন হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার সম্পূর্ণ গাইডলাইন

ডেস্ক রিপোর্ট
অ+
অ-
ফ্রিল্যান্সিং কী? নতুন হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার সম্পূর্ণ গাইডলাইন

আপনি কি চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত? নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা চান? তাহলে ফ্রিল্যান্সিং হতে পারে আপনার জন্য আদর্শ সমাধান। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ফ্রিল্যান্সিং শুধু একটি পেশা নয়, বরং জীবনযাপনের একটি নতুন ধরন। ঘরে বসে, নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করে আয়ের সুযোগ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা জানবো ফ্রিল্যান্সিং আসলে কী, কীভাবে শুরু করবেন এবং সফল হওয়ার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে। তো চলুন শুরু করা যাক।

ফ্রিল্যান্সিং আসলে কী জিনিস?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ফ্রিল্যান্সিং হলো স্বাধীনভাবে কাজ করার একটি পদ্ধতি। এখানে আপনি কোনো কোম্পানির নিয়মিত কর্মচারী নন, বরং আপনি একজন স্বাধীন পেশাদার যিনি বিভিন্ন ক্লায়েন্টের জন্য প্রজেক্ট ভিত্তিক কাজ করেন। ধরুন আপনি একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। এখন একজন ক্লায়েন্ট আপনাকে তার ব্যবসার জন্য একটি লোগো ডিজাইন করতে বললেন। আপনি সেই কাজটি করে দিলেন এবং নির্ধারিত পারিশ্রমিক পেলেন। এটাই ফ্রিল্যান্সিং।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আপনি নিজের বস নিজে। কখন কাজ করবেন, কতটুকু কাজ নেবেন, কার সাথে কাজ করবেন সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে। অফিসে গিয়ে নয় থেকে পাঁচটা বসে থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। চাইলে রাতে কাজ করতে পারেন, চাইলে সকালে। এমনকি বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কাজ করার সুযোগ আছে।

কোন কোন ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং করা যায়?

ফ্রিল্যান্সিংয়ের জগত অনেক বিশাল। প্রায় যেকোনো দক্ষতা নিয়েই এখানে কাজ করা সম্ভব। কিছু জনপ্রিয় ক্ষেত্রের কথা বলি।

ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট এখন অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন একটি সেক্টর। প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে এবং সেগুলোর জন্য দক্ষ ডিজাইনার ও ডেভেলপারের প্রয়োজন। গ্রাফিক্স ডিজাইনও সমান জনপ্রিয়। লোগো, ব্যানার, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে শুরু করে বই কভার ডিজাইন সবকিছুতেই দক্ষ ডিজাইনারের চাহিদা রয়েছে।

আপনি যদি লিখতে ভালোবাসেন তাহলে কনটেন্ট রাইটিং বা কপিরাইটিং আপনার জন্য। ব্লগ পোস্ট, আর্টিকেল, প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন, ইমেইল মার্কেটিং কপি সবকিছুর জন্যই লেখকের প্রয়োজন। ডিজিটাল মার্কেটিং আরেকটি বিশাল ক্ষেত্র। সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, এসইও, ইমেইল মার্কেটিং এসব নিয়ে কাজ করতে পারেন।

ভিডিও এডিটিং এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলসের জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার ভিডিও এডিট করার দরকার হয়। ডেটা এন্ট্রি, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, অ্যাকাউন্টিং, ট্রান্সলেশন এসব ক্ষেত্রেও প্রচুর কাজ আছে। এমনকি আপনি যদি কনসালট্যান্ট হতে চান কোনো বিষয়ে, সেটাও ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে করতে পারবেন।

ফ্রিল্যান্সিং শুরু করবেন কীভাবে?

এবার আসল প্রশ্নে আসা যাক। কীভাবে শুরু করবেন? প্রথম ধাপ হলো নিজের দক্ষতা চিহ্নিত করা। আপনি কী ভালো পারেন? কোন কাজে আপনার আগ্রহ আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন। মনে রাখবেন, শুধু টাকার জন্য এমন কাজ নেবেন না যেটা আপনার পছন্দ নয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদে সেই কাজে টিকে থাকা কঠিন হবে।

আপনার আগ্রহের ক্ষেত্র নির্বাচন করার পর বাজারে সেই কাজের চাহিদা কেমন সেটা দেখুন। হয়তো আপনি খুব ভালো ছবি আঁকতে পারেন, কিন্তু ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশনের চাহিদা বেশি। তাহলে সেদিকে মনোযোগ দিন। আগ্রহ এবং বাজারের চাহিদা এই দুইয়ের মাঝে একটা ভারসাম্য খুঁজে বের করুন।

দক্ষতা অর্জনের পথ

এখন প্রশ্ন হলো, দক্ষতা কীভাবে অর্জন করবেন? চিন্তার কোনো কারণ নেই। বর্তমানে অনলাইনে অসংখ্য শেখার সুযোগ রয়েছে। ইউটিউবে হাজার হাজার ফ্রি টিউটোরিয়াল পাবেন প্রায় সব বিষয়ে। ইউডেমি, কোর্সেরা, স্কিলশেয়ার এসব প্ল্যাটফর্মে পেইড কোর্স আছে যেগুলো খুবই মানসম্পন্ন। অনেক কোর্স আবার ডিসকাউন্টে পাওয়া যায়।

কোর্স করাই শেষ কথা নয়। আসল শিক্ষা হয় অনুশীলনের মাধ্যমে। প্রতিদিন একটু একটু করে প্র্যাকটিস করুন। ধরুন আপনি ওয়েব ডিজাইন শিখছেন। তাহলে নিজে নিজে ১০টা ওয়েবসাইট ডিজাইন করুন। ভুল হবে, সেটা স্বাভাবিক। ভুল থেকেই শিখবেন। একটা বিষয় মনে রাখবেন, কোনো কোর্স শেষ করার সার্টিফিকেট থেকে আপনার বাস্তব দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পোর্টফোলিও তৈরি করা কেন জরুরি?

পোর্টফোলিও হলো আপনার কাজের শোকেস। এটা দেখেই ক্লায়েন্টরা বুঝবেন আপনি কী মানের কাজ করতে পারেন। নতুন অবস্থায় তো কোনো ক্লায়েন্টের কাজ নেই, তাহলে পোর্টফোলিও কীভাবে বানাবেন? খুব সহজ। নিজে থেকে কিছু প্রজেক্ট তৈরি করুন।

মনে করুন আপনি গ্রাফিক ডিজাইনার। তাহলে কিছু কাল্পনিক ব্র্যান্ডের জন্য লোগো ডিজাইন করুন। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বানান। একটা ব্র্যান্ডিং প্রজেক্ট করুন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এগুলো আপনার পোর্টফোলিওতে যোগ করুন। ওয়েব ডিজাইনার হলে কয়েকটা ওয়েবসাইট ডিজাইন করুন বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার জন্য।

পোর্টফোলিও প্রদর্শনের জন্য নিজের একটা ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারেন। খরচ কম করতে চাইলে বিহ্যান্স, ড্রিবল এসব ফ্রি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন। পোর্টফোলিওতে শুধু কাজের ছবি নয়, প্রতিটা প্রজেক্টের পেছনের চিন্তাভাবনা, সমস্যা এবং সমাধান লিখুন। এতে ক্লায়েন্টরা বুঝবেন আপনি শুধু সুন্দর ডিজাইন নয়, সমস্যা সমাধানেও পারদর্শী।

সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন

এখন প্রশ্ন হলো কোথায় কাজ খুঁজবেন? অনলাইনে বেশ কিছু জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম আছে। আপওয়ার্ক সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। এখানে সব ধরনের কাজ পাওয়া যায়। ফাইভার আরেকটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম যেখানে আপনি নিজের সার্ভিস গিগ আকারে বিক্রি করতে পারেন। ফ্রিল্যান্সার ডটকম, টপটাল, পিপল পার আওয়ার এসব প্ল্যাটফর্মেও কাজ পাওয়া যায়।

প্রতিটা প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। আপওয়ার্কে প্রতিযোগিতা বেশি কিন্তু কাজের পরিমাণও প্রচুর। ফাইভারে আপনাকে নিজের সার্ভিস মার্কেটিং করতে হয়। নতুন অবস্থায় একাধিক প্ল্যাটফর্মে প্রোফাইল তৈরি করুন এবং সবগুলোতেই সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন। দেখবেন কোথায় আপনার জন্য বেশি সুযোগ আসছে।

পেশাদার প্রোফাইল তৈরির কৌশল

প্রোফাইল তৈরি করার সময় খুব সচেতন হতে হবে। এটাই আপনার প্রথম ইমপ্রেশন। একটা পেশাদার ছবি ব্যবহার করুন। ক্যাজুয়াল সেলফি নয়, একটা ভালো মানের প্রোফাইল ফটো দিন। হেডলাইন বা টাইটেল খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক লাইনে স্পষ্ট করে বলুন আপনি কী করেন। যেমন শুধু গ্রাফিক ডিজাইনার না লিখে লিখতে পারেন, আধুনিক ব্র্যান্ডিং এবং লোগো ডিজাইনে বিশেষজ্ঞ গ্রাফিক ডিজাইনার।

বায়ো বা ওভারভিউ সেকশনে নিজের সম্পর্কে বিস্তারিত লিখুন। আপনার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং কেন ক্লায়েন্ট আপনাকে বেছে নেবে সেটা তুলে ধরুন। খুব বেশি লম্বা করবেন না আবার খুব ছোটও নয়। তিন থেকে চার প্যারাগ্রাফ যথেষ্ট। নিজের পোর্টফোলিও লিংক অবশ্যই যোগ করুন। দক্ষতার তালিকা তৈরি করার সময় সঠিক কীওয়ার্ড ব্যবহার করুন যাতে সার্চে আপনার প্রোফাইল সহজে খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রথম কাজ পাওয়ার চ্যালেঞ্জ

সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো প্রথম কাজটা পাওয়া। কোনো রিভিউ নেই, রেটিং নেই, তাই ক্লায়েন্টরা বিশ্বাস করতে চান না। এই সময়টা হতাশ হওয়ার নয়, কৌশলী হওয়ার। প্রথম দিকে কম দামে কাজ নিতে পারেন। মনে রাখবেন এখন আপনার লক্ষ্য টাকা নয়, রিভিউ এবং অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা।

ছোট ছোট প্রজেক্ট দিয়ে শুরু করুন। বিশাল বড় প্রজেক্টের পেছনে না ছুটে যেগুলো দ্রুত শেষ করা যায় সেগুলো নিন। একটা ভালো রিভিউ পেলে পরের কাজ পাওয়া সহজ হয়। দশটা ছোট প্রজেক্ট করে দশটা পজিটিভ রিভিউ পাওয়া একটা বড় প্রজেক্ট থেকে ভালো ফলাফল দেবে। কয়েকটা ভালো রিভিউ পেলে আস্তে আস্তে দাম বাড়াতে পারবেন।

কার্যকরী প্রস্তাবনা লেখার শিল্প

জব পোস্টে বিড বা প্রস্তাবনা পাঠানো একটা শিল্প। বেশিরভাগ নতুন ফ্রিল্যান্সার এখানে ভুল করেন। তারা একটা সাধারণ টেমপ্লেট তৈরি করে সব জবে একই জিনিস পাঠান। এটা একদম ভুল পদ্ধতি। প্রতিটা জব পোস্ট ভালো করে পড়ুন। ক্লায়েন্ট কী চাচ্ছেন সেটা বুঝুন।

প্রস্তাবনা শুরু করুন ক্লায়েন্টের সমস্যা সম্পর্কে বলে। তাকে বুঝতে দিন যে আপনি তার প্রয়োজন সঠিকভাবে বুঝেছেন। তারপর বলুন কীভাবে আপনি সেই সমস্যার সমাধান করবেন। আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা বা পোর্টফোলিও থেকে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দিন। খুব লম্বা প্রস্তাবনা লিখবেন না। ক্লায়েন্টরা ব্যস্ত মানুষ। সংক্ষিপ্ত এবং পয়েন্ট টু পয়েন্ট লিখুন। শেষে একটা প্রশ্ন রাখতে পারেন যাতে ক্লায়েন্ট রিপ্লাই করতে উৎসাহিত হন।

মূল্য নির্ধারণের কৌশল

কত টাকা চার্জ করবেন এটা একটা বড় প্রশ্ন। খুব কম চার্জ করলে ক্লায়েন্ট মনে করবে আপনার কাজের মান খারাপ। আবার খুব বেশি চার্জ করলে কাজই পাবেন না। প্রথমে বাজার রিসার্চ করুন। একই ধরনের কাজে অন্যরা কত চার্জ করছে সেটা দেখুন। আপনার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিজের মূল্য নির্ধারণ করুন।

প্রজেক্ট বেসড নাকি ঘণ্টা হিসাবে চার্জ করবেন সেটা ঠিক করুন। নতুন অবস্থায় প্রজেক্ট বেসড ভালো কারণ ক্লায়েন্ট জানেন মোট কত খরচ হবে। তবে বড় প্রজেক্টে ঘণ্টা হিসাবে ভালো। প্যাকেজ অফার তৈরি করতে পারেন। যেমন লোগো ডিজাইনের সাথে বিজনেস কার্ড এবং লেটারহেড ডিজাইন প্যাকেজ হিসেবে অফার করুন। এতে ক্লায়েন্ট ভ্যালু পান এবং আপনিও বেশি আয় করতে পারেন।

সময়ের সাথে দাম বাড়ানো জরুরি। প্রতি ছয় মাস বা এক বছর পর নিজের মূল্য পর্যালোচনা করুন। দক্ষতা বেড়েছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে তাহলে দামও বাড়ান। নতুন ক্লায়েন্টদের জন্য নতুন দাম। পুরনো ক্লায়েন্টদের আগের দামে কিছুদিন কাজ করে দিতে পারেন তবে তাদেরকেও জানিয়ে দিন যে দাম বেড়েছে।

সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

ফ্রিল্যান্সিংয়ে সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অফিসে চাকরিতে একটা রুটিন থাকে কিন্তু এখানে সব আপনার হাতে। অনেকে মনে করেন ফ্রিল্যান্সিং মানে সারাদিন আরাম করা। বাস্তবে উল্টো। সফল ফ্রিল্যান্সাররা সাধারণ চাকরিজীবীদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন।

একটা দৈনিক রুটিন তৈরি করুন এবং সেটা মেনে চলুন। সকালে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু করুন। বিরতি নিন, খাওয়া দাওয়া করুন তারপর আবার কাজে ফিরুন। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করুন। বাসায় কাজ করলেও কাজের পরিবেশ তৈরি করুন। একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকুক যেটা শুধু কাজের জন্য। এতে ফোকাস ধরে রাখতে সুবিধা হয়।

একাধিক প্রজেক্ট থাকলে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট টুল ব্যবহার করুন। ট্রেলো, আসানা বা নোশন খুবই কাজের টুল। প্রতিটা প্রজেক্টের ডেডলাইন, কাজের তালিকা এবং অগ্রগতি ট্র্যাক করতে পারবেন। টু ডু লিস্ট তৈরি করার অভ্যাস করুন। সকালে উঠে দিনের কাজের একটা লিস্ট বানান এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন।

ক্লায়েন্ট সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা

ভালো কাজ করা যেমন জরুরি, তেমনি ক্লায়েন্টের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ রাখুন নিয়মিত। প্রজেক্টের অগ্রগতি সম্পর্কে জানান। কোনো সমস্যা হলে লুকাবেন না, সরাসরি বলুন এবং সমাধান দিন। ক্লায়েন্টরা সততা এবং স্বচ্ছতা পছন্দ করেন।

ডেডলাইন মেনে চলুন। সময়মতো কাজ জমা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি মনে হয় সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে না তাহলে আগে থেকেই জানান এবং অতিরিক্ত সময় চান। শেষ মুহূর্তে বলবেন না। কাজ জমা দেওয়ার পর ফিডব্যাক চান। ক্লায়েন্ট কী পছন্দ করলেন কী করলেন না সেটা জানুন এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে উন্নত করুন।

সন্তুষ্ট ক্লায়েন্ট আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তারা বারবার কাজ দেবেন এবং অন্যদের কাছে আপনার নাম বলবেন। একজন সন্তুষ্ট ক্লায়েন্ট দশজন নতুন ক্লায়েন্ট আনতে পারেন। তাই প্রতিটা ক্লায়েন্টকে ভ্যালু দিন এবং তাদের প্রত্যাশার চেয়ে একটু বেশি দেওয়ার চেষ্টা করুন।

ক্রমাগত শেখা এবং নিজেকে আপডেট রাখা

প্রযুক্তির জগত প্রতিদিন বদলাচ্ছে। আজ যে স্কিল চাহিদায় আছে কাল সেটা পুরনো হয়ে যেতে পারে। তাই থেমে থাকলে চলবে না। নিয়মিত নতুন জিনিস শিখতে হবে। ধরুন আপনি ওয়েব ডিজাইনার। নতুন ডিজাইন ট্রেন্ড কী সেটা জানতে হবে। নতুন টুল এবং সফটওয়্যার আসছে সেগুলো শিখতে হবে।

অনলাইন কমিউনিটিতে সক্রিয় থাকুন। ফেসবুক গ্রুপ, রেডিট, ডিসকর্ড সার্ভারে ফ্রিল্যান্সারদের কমিউনিটি আছে। সেখানে জয়েন করুন। অন্যদের সাথে অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, প্রশ্ন করুন, সাহায্য নিন। এই কমিউনিটি থেকে অনেক কিছু শেখা যায় যা কোনো কোর্সে শেখানো হয় না।

ব্লগ পড়ুন, পডকাস্ট শুনুন, ইউটিউব ভিডিও দেখুন আপনার ক্ষেত্র সম্পর্কিত। প্রতি সপ্তাহে কিছু সময় রাখুন শুধু শেখার জন্য। হয়তো একটা নতুন টিউটোরিয়াল ফলো করুন বা একটা নতুন টেকনিক শিখুন। এই ছোট ছোট বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে বিশাল ফলাফল দেয়।

আর্থিক পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনা

ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় অনিয়মিত। এই মাসে ভালো আয় হলো, পরের মাসে হয়তো কম। তাই আর্থিক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই একটা জরুরি তহবিল তৈরি করুন। কমপক্ষে তিন থেকে ছয় মাসের খরচের সমান টাকা সঞ্চয় করে রাখুন। কোনো কারণে কাজ না পেলে বা অসুস্থ হয়ে গেলে এই তহবিল কাজে আসবে।

আয় এবং খরচের হিসাব রাখুন। একটা স্প্রেডশিট বানান বা অ্যাকাউন্টিং অ্যাপ ব্যবহার করুন। প্রতিটা প্রজেক্ট থেকে কত আয় হলো, কী কী খরচ হলো সব রেকর্ড করুন। এতে ট্যাক্স দেওয়ার সময় সুবিধা হবে এবং ব্যবসার আর্থিক অবস্থা বুঝতে পারবেন।

ট্যাক্স সম্পর্কে সচেতন থাকুন। ফ্রিল্যান্সারদেরও আয়কর দিতে হয়। নিয়ম কানুন জেনে নিন এবং সময়মতো ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিন। প্রয়োজনে একজন অ্যাকাউন্ট্যান্টের সাহায্য নিন। শুরুতেই এই বিষয়ে সচেতন হলে পরে ঝামেলা এড়ানো যায়।

আয়ের একটা অংশ অবশ্যই সঞ্চয় করুন। শুধু আজকের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও ভাবতে হবে। বিনিয়োগ করুন, রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান করুন। মনে রাখবেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে কোম্পানির পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকেই সুরক্ষিত করতে হবে।

নেটওয়ার্কিং এর শক্তি

অনেকে মনে করেন ফ্রিল্যান্সিং মানে একা একা কাজ করা। এটা ভুল ধারণা। নেটওয়ার্কিং ফ্রিল্যান্সিংয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিংকডইনে সক্রিয় থাকুন। নিয়মিত পোস্ট করুন, অন্যদের পোস্টে কমেন্ট করুন, কানেকশন তৈরি করুন। আপনার ক্ষেত্রের মানুষদের সাথে সংযুক্ত হন।

লোকাল মিটআপ এবং ইভেন্টে যোগ দিন। অনেক শহরে ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্যোক্তাদের নিয়মিত মিটআপ হয়। সেখানে গিয়ে মানুষের সাথে পরিচিত হন। সরাসরি দেখা করলে সম্পর্ক অনেক শক্তিশালী হয়। এখান থেকে নতুন কাজ, কোলাবরেশনের সুযোগ এমনকি বন্ধুত্বও তৈরি হতে পারে।

অন্য ফ্রিল্যান্সারদের সাথে কোলাবরেট করুন। ধরুন আপনি ওয়েব ডিজাইনার। একজন ওয়েব ডেভেলপারের সাথে পার্টনারশিপ করুন। আপনি ডিজাইন করবেন, সে ডেভেলপ করবে। একসাথে সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট প্যাকেজ অফার করতে পারবেন। এতে দুজনেরই লাভ।

রেফারেল সিস্টেম তৈরি করুন। যে ক্লায়েন্টরা আপনার কাজে সন্তুষ্ট তাদের বলুন আশেপাশে কেউ আপনার সার্ভিস খুঁজলে যেন আপনার নাম বলেন। এমনকি একটা ছোট ইনসেন্টিভ দিতে পারেন রেফারেলের জন্য। ওয়ার্ড অফ মাউথ মার্কেটিং এখনও সবচেয়ে কার্যকর।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং মানসিক শক্তি

ফ্রিল্যান্সিং এর পথ সবসময় মসৃণ নয়। অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে। প্রথম দিকে হয়তো কাজ পাবেন না। প্রস্তাবনা পাঠিয়ে কোনো রিপ্লাই আসবে না। এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সবাই এই পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। হতাশ হবেন না। মনে রাখবেন প্রতিটা না এর পরে একটা হ্যাঁ অপেক্ষা করছে।

প্রত্যাখ্যান নিতে শিখুন। কোনো ক্লায়েন্ট আপনার কাজ পছন্দ করলেন না বা অন্য কাউকে বেছে নিলেন তাতে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। এটা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। হয়তো আপনার স্টাইল ম্যাচ করেনি বা বাজেট ম্যাচ করেনি। পরের সুযোগে মনোযোগ দিন।

একাকীত্ব একটা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। অফিসে চাকরিতে সহকর্মী থাকে, আড্ডা হয়। ফ্রিল্যান্সিংয়ে সারাদিন একা কাজ করতে করতে মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগতে পারে। এই সমস্যার সমাধান হলো কো-ওয়ার্কিং স্পেস ব্যবহার করা। অনেক শহরে এখন কো-ওয়ার্কিং স্পেস আছে যেখানে ফ্রিল্যান্সাররা একসাথে কাজ করেন। না হলে কফি শপে বসে কাজ করতে পারেন।

ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স মেইনটেইন করা কঠিন। বাসায় কাজ করলে কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের লাইন ঝাপসা হয়ে যায়। নির্দিষ্ট কাজের সময় ঠিক করুন এবং সেটা মেনে চলুন। কাজের সময় কাজ করুন, ছুটির সময় পরিবার বা বন্ধুদের সাথে থাকুন। নিজের জন্য সময় রাখুন। শখের কাজ করুন, ব্যায়াম করুন, বাইরে ঘুরতে যান।

দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের কৌশল

ফ্রিল্যান্সিং শুধু একটা সাইড ইনকাম নয়, এটা একটা পূর্ণাঙ্গ ক্যারিয়ার হতে পারে। কিন্তু সেজন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে। পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান সেটা ভাবুন। শুধু ফ্রিল্যান্সার থাকবেন নাকি একটা এজেন্সি খুলবেন? নাকি নিজের প্রোডাক্ট তৈরি করবেন?

নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করুন। আপনার নাম একটা ব্র্যান্ড হয়ে উঠুক। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত কনটেন্ট শেয়ার করুন। ব্লগ লিখুন, ভিডিও বানান। নিজের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন। এতে আপনাকে একজন এক্সপার্ট হিসেবে দেখা হবে এবং ক্লায়েন্টরা নিজে থেকেই আপনার কাছে আসবেন।

প্যাসিভ ইনকামের উৎস তৈরি করুন। শুধু সার্ভিস বিক্রি নয়, প্রোডাক্টও বিক্রি করতে পারেন। ধরুন আপনি গ্রাফিক ডিজাইনার। তাহলে টেমপ্লেট বানিয়ে বিক্রি করতে পারেন। ওয়েব ডেভেলপার হলে থিম বা প্লাগিন বানিয়ে বিক্রি করুন। অনলাইন কোর্স তৈরি করতে পারেন। এগুলো একবার বানালে বারবার বিক্রি হয় এবং প্যাসিভ ইনকাম হয়।

স্কেল করার চিন্তা করুন। একা কাজ করলে একটা লিমিট আছে। দিনে তো আর ২৪ ঘণ্টার বেশি কাজ করা যায় না। তাই কাজের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে টিম তৈরি করতে হবে। প্রথমে হয়তো একজন ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিন। পরে আরও ফ্রিল্যান্সার নিয়ে ছোট টিম তৈরি করুন। বড় প্রজেক্ট নিতে পারবেন এবং আয়ও বাড়বে।

মার্কেটিং এবং নিজেকে তুলে ধরা

শুধু ভালো কাজ জানলেই হবে না, সেটা মানুষকে জানাতেও হবে। মার্কেটিং একটা গুরুত্বপূর্ণ স্কিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত আপনার কাজ শেয়ার করুন। বিফোর আফটার দেখান, প্রজেক্টের পেছনের গল্প বলুন। মানুষ গল্প ভালোবাসে। শুধু কাজের ছবি নয়, কীভাবে সেই কাজ করলেন, কী চ্যালেঞ্জ ছিল, কীভাবে সমাধান করলেন সেটা শেয়ার করুন।

কেস স্টাডি তৈরি করুন। একটা প্রজেক্ট নিয়ে বিস্তারিত লিখুন। ক্লায়েন্টের সমস্যা কী ছিল, আপনি কী সমাধান দিলেন, ফলাফল কী হলো এসব। এটা পটেনশিয়াল ক্লায়েন্টদের বুঝতে সাহায্য করে আপনি কীভাবে কাজ করেন।

টেস্টিমোনিয়াল সংগ্রহ করুন। সন্তুষ্ট ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে রিভিউ চান। ভিডিও টেস্টিমোনিয়াল পেলে আরও ভালো। এগুলো আপনার ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন। মানুষ অন্যদের মতামত দেখে সিদ্ধান্ত নেয়।

ইমেইল মার্কেটিং করতে পারেন। একটা নিউজলেটার শুরু করুন। পটেনশিয়াল এবং পুরনো ক্লায়েন্টদের নিয়মিত ইমেইল পাঠান। আপনার নতুন কাজ, সার্ভিস বা অফার সম্পর্কে জানান। তবে স্প্যাম করবেন না। ভ্যালু দিন প্রতিটা ইমেইলে।

শেষ কথা

ফ্রিল্যান্সিং একটা চমৎকার ক্যারিয়ার অপশন যা আপনাকে স্বাধীনতা এবং নমনীয়তা দেয়। কিন্তু এটা সহজ নয়। পরিশ্রম, ধৈর্য এবং ধারাবাহিকতা লাগবে। প্রথম কয়েক মাস কঠিন হবে, এটা মেনে নিয়েই শুরু করুন। কিন্তু যদি আপনি সঠিক পথে এগোন, নিয়মিত শিখতে থাকেন এবং ভালো কাজ করেন তাহলে সফল হবেনই।মনে রাখবেন প্রতিটা বড় ফ্রিল্যান্সার একদিন শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন। তাদেরও প্রথম কাজ পেতে কষ্ট হয়েছে, প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কিন্তু তারা হাল ছাড়েননি। আপনিও পারবেন। আজ থেকেই শুরু করুন। একটা স্কিল বেছে নিন, শিখতে শুরু করুন, পোর্টফোলিও তৈরি করুন এবং প্রথম কাজের জন্য চেষ্টা শুরু করুন।

ফ্রিল্যান্সিং শুধু একটা পেশা নয়, এটা একটা জীবনধারা। যারা স্বাধীনতা ভালোবাসেন, নিজের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে চান এবং নিজের দক্ষতা দিয়ে কিছু তৈরি করার আনন্দ পেতে চান তাদের জন্য এটা আদর্শ। তো আর দেরি কেন? আজই আপনার ফ্রিল্যান্সিং যাত্রা শুরু করুন এবং নিজের স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়ে তুলুন।

ট্যাগস:

ফ্রিল্যান্সিং গাইডঅনলাইন আয়ক্যারিয়ারআউটসোর্সিং

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন