রাষ্ট্রবিজ্ঞান
মৌলিক গণতন্ত্র ও ভিশন ২০২১ কী?

মোঃ সুমন মিয়া
প্রকাশঃ ৯ নভেম্বর ২০২৫, ৮:৪২ এএম

ভূমিকা
রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন এবং উন্নয়নের দিকনির্দেশনা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মৌলিক গণতন্ত্র এবং ভিশন ২০২১ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদিও এদের সময়কাল এবং উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৌলিক গণতন্ত্র ছিল পাকিস্তান আমলের একটি বিতর্কিত শাসনব্যবস্থা, অন্যদিকে ভিশন ২০২১ স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন। এই প্রবন্ধে আমরা উভয় বিষয়ের পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং প্রভাব বিশ্লেষণ করব।
মৌলিক গণতন্ত্রের পরিচয়
মৌলিক গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্রেসি ছিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের প্রবর্তিত একটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। ১৯৫৯ সালে সামরিক শাসনামলে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে একটি পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা। এই ব্যবস্থায় সাধারণ জনগণ শুধুমাত্র মৌলিক গণতন্ত্রবিদ নামে কিছু প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারতেন, আর এই প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্রপতি ও আইনসভার সদস্য নির্বাচন করতেন।
পূর্ব পাকিস্তানে চল্লিশ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্তানে চল্লিশ হাজার মিলে মোট আশি হাজার মৌলিক গণতন্ত্রবিদ নির্বাচিত হতেন। তারা ইউনিয়ন কাউন্সিল, থানা কাউন্সিল এবং জেলা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আইয়ুব খান প্রকৃত গণতন্ত্রের নামে সীমিত ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা করেছিলেন। তবে বাস্তবে এটি ছিল সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল, যা জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব করেছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
ভিশন ২০২১ এর রূপরেখা
ভিশন ২০২১ হলো বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা, যা ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই রূপকল্পকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২১ সাল অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মধ্যে দেশকে একটি মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত করা।
ভিশন ২০২১ এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এই রূপকল্পের আওতায় বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার দিকে অগ্রসর হয়েছে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও প্রভাব
মৌলিক গণতন্ত্র এবং ভিশন ২০২১ এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মৌলিক গণতন্ত্র ছিল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সংকুচিত করেছিল এবং জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ সীমিত করেছিল। এটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছিল। অন্যদিকে ভিশন ২০২১ একটি ইতিবাচক উন্নয়ন পরিকল্পনা যা দেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। ভিশন ২০২১ শুধু একটি স্বপ্ন ছিল না, বরং একটি বাস্তবসম্মত রূপকল্প যা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করেছে।
উপসংহার
মৌলিক গণতন্ত্র ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায়, যা গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করে জনগণের ক্ষোভের কারণ হয়েছিল। পক্ষান্তরে ভিশন ২০২১ স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি উজ্জ্বল দিকনির্দেশনা, যা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছে। এই দুই ধারণার তুলনা আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত উন্নয়ন এবং অগ্রগতি আসে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের কল্যাণমুখী পরিকল্পনা থেকে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধরে রেখে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার ওপর।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন