KOFIPOST

KOFIPOST

ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা-অসুবিধা, ব্যবহারের আগে যা জানা জরুরি

ডেস্ক রিপোর্ট
অ+
অ-
ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা-অসুবিধা, ব্যবহারের আগে যা জানা জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক যুগে আর্থিক লেনদেনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ক্রেডিট কার্ড। বাংলাদেশেও এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের ক্রেডিট কার্ড সেবা প্রদান করছে। তবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের আগে এর সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

ফেসবুক

টেলিগ্রাম

ক্রেডিট কার্ডের প্রধান সুবিধা হলো তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের প্রয়োজন ছাড়াই কেনাকাটা করার সুযোগ। জরুরি মুহূর্তে হাতে টাকা না থাকলেও প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো যায়। চিকিৎসা জরুরি অবস্থা, অপ্রত্যাশিত ভ্রমণ বা হঠাৎ কোনো প্রয়োজনে ক্রেডিট কার্ড জীবনরক্ষাকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। অনলাইন শপিং, হোটেল বুকিং, বিমানের টিকিট কাটা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড অত্যন্ত সুবিধাজনক।

অনেক ক্রেডিট কার্ডে রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক এবং বিভিন্ন ডিসকাউন্ট অফার পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁ, শপিং মল বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়। কিছু প্রিমিয়াম কার্ডে বিমানবন্দর লাউঞ্জ ব্যবহার, বিনামূল্যে ভ্রমণ বিমা এবং কনসিয়ার্জ সেবার মতো এক্সক্লুসিভ সুবিধাও রয়েছে। এসব সুবিধা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে বছরে অনেক টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

মাসিক কিস্তিতে বড় পরিমাণের কেনাকাটা করার সুবিধাও ক্রেডিট কার্ডের একটি আকর্ষণীয় দিক। ইএমআই সুবিধা ব্যবহার করে ব্যয়বহুল ইলেকট্রনিক্স পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী বা এমনকি শিক্ষার খরচও সহজেই বহন করা সম্ভব। অনেক ব্যাংক শূন্য সুদে ইএমআই সুবিধা দিয়ে থাকে, যা আর্থিক পরিকল্পনায় বেশ সহায়ক। পরিকল্পিত ব্যবহারে ক্রেডিট স্কোর উন্নত হয়, যা ভবিষ্যতে গৃহঋণ বা গাড়ি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে আর্থিক নিরাপত্তার একটি অতিরিক্ত স্তর পাওয়া যায়। নগদ অর্থ হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু ক্রেডিট কার্ড হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে তাৎক্ষণিক ব্লক করে আর্থিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অধিকাংশ ব্যাংক জালিয়াতি সুরক্ষা প্রদান করে, যা গ্রাহকদের অননুমোদিত লেনদেন থেকে রক্ষা করে।

তবে ক্রেডিট কার্ডের কিছু উল্লেখযোগ্য অসুবিধাও রয়েছে যা ব্যবহারকারীদের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত খরচের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া এর মূল সমস্যা। হাতে নগদ টাকা না দেখে অনেকেই অতিরিক্ত খরচ করে ফেলেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্লাস্টিক কার্ড ব্যবহারে মানুষের মস্তিষ্কে খরচের বেদনা কম অনুভূত হয়, ফলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বেড়ে যায়।

নির্দিষ্ট সময়ে বিল পরিশোধ না করলে উচ্চ সুদের হার এবং জরিমানা গুনতে হয়। বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বার্ষিক ২০ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা অন্যান্য ঋণের তুলনায় অনেক বেশি। শুধুমাত্র ন্যূনতম পরিমাণ পরিশোধ করলে মূল ঋণ কমে না বরং সুদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এভাবে অনেকেই ঋণের চক্রে আটকা পড়েন।

বার্ষিক ফি, লুকানো চার্জ এবং বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনের অতিরিক্ত খরচও অনেকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ক্যাশ উত্তোলনে উচ্চ চার্জ, লেট পেমেন্ট ফি, ওভার লিমিট ফি এবং কার্ড রিপ্লেসমেন্ট চার্জের মতো বিভিন্ন খরচ রয়েছে। এসব চার্জ সম্পর্কে অসচেতন থাকলে মাস শেষে বিশাল বিল দেখে হতবাক হতে হয়।

ক্রেডিট কার্ড মূলত নিয়মিত আয়ের চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং পেশাদার ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত। যাদের স্থিতিশীল মাসিক আয় রয়েছে এবং আর্থিক পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতন, তারা ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যম ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সাধারণত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পান।

ঘন ঘন ভ্রমণকারী এবং অনলাইনে নিয়মিত কেনাকাটা করেন যারা, তাদের জন্যও ক্রেডিট কার্ড প্রায় অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সাইট থেকে পণ্য কেনা, সাবস্ক্রিপশন সেবা গ্রহণ বা বিদেশে ভ্রমণের সময় ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অনেক কাজই করা কঠিন। ফ্রিল্যান্সার এবং অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্যও ক্রেডিট কার্ড একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার।

অপরদিকে, অস্থায়ী আয়ের ব্যক্তি, শিক্ষার্থী বা যাদের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হয়, তাদের জন্য ক্রেডিট কার্ড ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নতুন চাকরিজীবী যারা এখনো আর্থিক ব্যবস্থাপনা শিখছেন, তাদেরও সাবধান থাকা উচিত। দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার না করলে ক্রেডিট কার্ড আর্থিক সংকটের কারণ হতে পারে।

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ মেনে চললে এর সুবিধা সর্বোচ্চ করা সম্ভব। প্রথমত, সবসময় বাজেটের মধ্যে থেকে খরচ করা উচিত। ক্রেডিট লিমিটের পুরোটা ব্যবহার না করে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ভালো। দ্বিতীয়ত, প্রতি মাসে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। এতে সুদ দিতে হয় না এবং ক্রেডিট স্কোরও ভালো থাকে।

তৃতীয়ত, একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকলে সেগুলোর ব্যবহার এবং পেমেন্ট ডেট সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক। অ্যাপ বা রিমাইন্ডার ব্যবহার করে পেমেন্ট মিস করা এড়ানো যায়। চতুর্থত, ক্যাশ অ্যাডভান্স বা নগদ উত্তোলন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এতে অত্যধিক চার্জ দিতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রেডিট কার্ড একটি শক্তিশালী আর্থিক হাতিয়ার, তবে এর ব্যবহারে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক ব্যবহারে এটি আর্থিক নমনীয়তা এবং সুবিধা প্রদান করে। কিন্তু অসতর্ক ব্যবহারে এটি আর্থিক দুর্দশার কারণ হতে পারে। তাই ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার আগে নিজের আর্থিক অবস্থা, খরচের ধরন এবং পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষিত করা। স্বচ্ছ তথ্য প্রদান এবং দায়িত্বশীল ঋণ প্রদানের মাধ্যমে গ্রাহকদের আর্থিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। পরিশেষে বলা যায়, ক্রেডিট কার্ড আশীর্বাদ না অভিশাপ তা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর সচেতনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের উপর।

ট্যাগস:

ক্রেডিট কার্ডব্যাংকিং সেবাআর্থিক পরামর্শ

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন