কোবরা ইফেক্ট কি? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর ভয়ঙ্কর প্রভাব
মোঃ মাসুদ রানা
প্রকাশঃ ১৬ নভেম্বর ২০২৫, ১:১৪ পিএম

কোবরা ইফেক্ট একটি বিশেষ পরিস্থিতি যা তখন ঘটে যখন কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ আসলে সেই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে বা সম্পূর্ণ নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। আপাতদৃষ্টিতে সহজ এবং কার্যকর মনে হওয়া সমাধান কীভাবে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে তার একটি চমৎকার উদাহরণ এই কোবরা ইফেক্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরনের ঘটনা বারবার দেখা গেছে যেখানে সরল সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে সমস্যা আরও গভীর হয়েছে।
এই শব্দটির উৎপত্তি ব্রিটিশ ভারতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে। ১৯০০ সালের দিকে যখন ব্রিটিশরা ভারত শাসন করছিল তখন দিল্লিতে কোবরা সাপের উৎপাত একটি বড় সমস্যা ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিটি মৃত কোবরার বিনিময়ে নগদ পুরস্কার ঘোষণা করে। প্রাথমিকভাবে এই নীতি সফল বলে মনে হয়েছিল কারণ সাপ ধরার লোকেরা পুরস্কার দাবি করছিল এবং শহরে কম সাপ দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রতি মাসে মৃত কোবরার সংখ্যা কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষ উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে এবং বাড়িতে কোবরা পালন শুরু করে যেগুলো মেরে পুরস্কার সংগ্রহ করত। সরকার যখন বুঝতে পারল যে তারা আসলে একই পরিমাণ পুরস্কার দিচ্ছে কিন্তু শহরে কোবরার সংখ্যা কমছে না তখন তারা পুরস্কার প্রথা বাতিল করে দেয়। এর ফলে যারা বাড়িতে কোবরা পালন করছিল তারা মূল্যহীন হয়ে যাওয়া সাপগুলো রাস্তায় ছেড়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে পুরস্কার প্রথা শুরুর আগের চেয়ে বেশি কোবরার সমস্যা দেখা দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় যা সফলভাবে কমপক্ষে চারটি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করেছিল। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের শেষ দুটি সাধারণ নির্বাচন বিরোধী দলের বর্জন এবং ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে কলঙ্কিত হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থার এই পরিবর্তন যা আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীলতা আনার জন্য করা হয়েছিল তা আসলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর করেছে। ফ্রিডম হাউসের ২০০৭ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর হতো এবং নির্বাচনগুলো প্রতিযোগিতামূলক ছিল। কিন্তু এখন নির্বাচনী কারসাজি ভয়ভীতি এবং সরাসরি সহিংসতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পরপর চারটি মেয়াদে জয়লাভ করেছে।
দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও কোবরা ইফেক্ট স্পষ্ট। সিপিআই ২০২৪ এর তথ্য সময়কালে দেশে চরম দুর্নীতিচালিত কর্তৃত্ববাদ দেখা গেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও শাসন ব্যবস্থা দুর্নীতি প্রচার ও সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি চুক্তি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক সরকারি খাতে দুর্নীতি আরও তীব্র হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি উপলব্ধি সূচকে বাংলাদেশ কম স্কোর করলেও অন্যান্য দেশের অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় চার ধাপ এগিয়েছে। দেশটি ১০০ এর মধ্যে ২৩ স্কোর পেয়েছে যা আগের বছরের তুলনায় এক পয়েন্ট কম এবং ১৩ বছরে সর্বনিম্ন। এই স্কোর নিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫১তম স্থানে রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করে যা ১৫ বছরের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দিকে পরিচালিত করে। যা শুরু হয়েছিল বৈষম্যমূলক সরকারি চাকরির কোটার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে তা রূপান্তরিত হয় দেশব্যাপী শাসন পরিবর্তনের দাবিতে। অভূতপূর্ব সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নে চিহ্নিত এই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
সরকারি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পও কোবরা ইফেক্টের শিকার হয়েছে। সারা দেশে হাজার হাজার কৃষক ধান কাটার যন্ত্র পাওয়ার কথা ছিল যেখানে প্রকল্প খরচের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চ্যানেল ২৪ এর তদন্তে দেখা গেছে সরকারি সংস্থার সদস্যরা প্রান্তিক কৃষকদের শোষণ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা যন্ত্রপাতি ক্রয়ই করেননি ফলে কৃষকরা প্রতিশ্রুত সরঞ্জাম ছাড়াই রয়ে গেছে। অন্য ক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে যা কখনোই সঠিকভাবে কাজ করেনি।
গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বছরে গড়ে ৭.৫৩ বিলিয়ন ডলার বা তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ১৭.৯৫ শতাংশ হারিয়েছে বাণিজ্য মিসইনভয়েসিংয়ের কারণে যেখানে কোম্পানিগুলো কম কর দেওয়ার জন্য তাদের আমদানি রপ্তানির কম মূল্য ঘোষণা করেছে।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রথম-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ভোটিং পদ্ধতি বজায় রাখা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে যা সমালোচকদের মতে বাংলাদেশের বিষাক্ত রাজনীতিতে অবদান রেখেছে কার্যত দুই দলীয় ব্যবস্থা তৈরি করে। তারা যুক্তি দেন যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে স্থানান্তর আরও রাজনৈতিক দলের জন্য জায়গা তৈরি করবে।
কোবরা ইফেক্টের প্রাথমিক কারণ হলো অতি সরলীকরণ। যদি একটি জটিল সমস্যাকে পরিমাপ বা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ করা হয় তাহলে অন্যান্য বিষয়গুলো প্রত্যাশিত ফলাফল নির্ধারণে উচ্চতর ভূমিকা পালন করবে। আমরা যদি অনাকাঙ্ক্ষিত নীতি বিস্ময় এড়াতে চাই তাহলে জটিল সামাজিক পরিবেশগত ব্যবস্থায় কার্যকারণের পরিচালনা সম্পর্কে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি উন্নত করতে হবে।
সিভিল সার্ভিসের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতির যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ দুর্নীতি উপলব্ধি সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম স্থানে রয়েছে। ঘুষ সবচেয়ে প্রচলিত সমস্যা। হাসিনার শাসনকাল জুড়ে অনেক সিভিল সার্ভেন্ট ইনসাইডার স্টক তথ্য শেয়ার করা এবং তহবিল আত্মসাতের অভিযুক্তদের তালিকা থেকে নাম সরানোর মতো কার্যক্রমে জড়িত ছিল।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই কোবরা ইফেক্ট এড়িয়ে প্রকৃত সংস্কার সাধন করা। আইন প্রণেতাদের সচেতন থাকা উচিত যে প্রতিটি মানবীয় কর্মের উদ্দিষ্ট এবং অনিচ্ছাকৃত উভয় পরিণতি রয়েছে। মানুষ সরকার আরোপিত প্রতিটি নিয়ম বিধি এবং আদেশে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং তাদের প্রতিক্রিয়া আইন প্রণেতাদের উদ্দিষ্ট ফলাফল থেকে বেশ ভিন্ন হতে পারে। সুতরাং আইন প্রণয়নের স্থান থাকলেও সেই স্থানটি মহান সতর্কতা এবং প্রচণ্ড নম্রতা উভয় দ্বারা সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোবরা ইফেক্ট থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। সহজ সমাধানের পরিবর্তে সমস্যার গভীরে গিয়ে এর সকল দিক বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধুমাত্র তাহলেই দেশ প্রকৃত উন্নতি ও স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন